বজ্রপাত কেন হয়, কীভাবে বজ্রপাত সৃষ্টি হয় এবং বজ্রপাতের সময় কী করলে নিরাপদ থাকা যায়—জেনে নিন বজ্রপাত থেকে বাঁচার কার্যকর উপায় ও করণীয়।
বাংলাদেশে কালবৈশাখী বা বর্ষার আগমনের সময় আকাশে কালো মেঘ জমে হঠাৎ বিদ্যুৎ চমকানো এবং বিকট শব্দে বজ্রপাত হওয়া খুবই পরিচিত একটি প্রাকৃতিক ঘটনা। কয়েক মুহূর্তের একটি বজ্রপাত কখনো কখনো মানুষের জীবন কেড়ে নিতে পারে, গবাদিপশুর ক্ষতি করতে পারে এবং ঘরবাড়ি ও বৈদ্যুতিক যন্ত্রপাতিরও ক্ষতি করতে পারে। বিশেষ করে খোলা মাঠে কৃষিকাজ, মাছ ধরা বা বাইরে চলাচলের সময় বজ্রপাতের ঝুঁকি বেড়ে যায়।
কিন্তু বজ্রপাত কেন হয়? মেঘের মধ্যে কীভাবে এত বিপুল বৈদ্যুতিক শক্তি জমা হয়? বজ্রপাতের সময় কোথায় আশ্রয় নেওয়া নিরাপদ এবং কোন কাজগুলো করা উচিত নয়? এসব প্রশ্নের উত্তর জানা থাকলে ঝুঁকিপূর্ণ পরিস্থিতিতে দ্রুত সঠিক সিদ্ধান্ত নেওয়া সম্ভব।
এই প্রতিবেদনে বজ্রপাতের বৈজ্ঞানিক কারণ থেকে শুরু করে বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে এর ঝুঁকি এবং বজ্রপাত থেকে বাঁচার বাস্তবসম্মত উপায় সহজ ভাষায় আলোচনা করা হলো।
বাংলাদেশে বজ্রপাত কেন একটি গুরুত্বপূর্ণ সমস্যা
বাংলাদেশে বজ্রপাতকে শুধু একটি সাধারণ আবহাওয়াজনিত ঘটনা হিসেবে দেখলে এর ঝুঁকির মাত্রা বোঝা কঠিন। দেশের বিস্তীর্ণ গ্রামাঞ্চলে মানুষ কৃষিকাজ, মাছ ধরা, নৌযাত্রা এবং বিভিন্ন ধরনের বাইরের কাজে দীর্ঘ সময় কাটান। ফলে বজ্রঝড়ের সময় অনেক মানুষ খোলা জায়গায় অবস্থান করেন।
বাংলাদেশ সরকারের বিভিন্ন তথ্যভান্ডারেও বজ্রপাতকে দুর্যোগের একটি স্বতন্ত্র ধরন হিসেবে অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে। সরকারের SDG Tracker-এ দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা অধিদপ্তরের তথ্যের মধ্যে বজ্রপাতজনিত মৃত্যু আলাদাভাবে হিসাব করা হয়। একই সঙ্গে দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা অধিদপ্তরের Lightning Information Management System বা LIMS রয়েছে, যা বজ্রপাত-সংক্রান্ত তথ্য ব্যবস্থাপনার জন্য ব্যবহৃত হয়।
বাংলাদেশে বজ্রপাতের প্রাণহানির সংখ্যা নিয়ে বিভিন্ন গবেষণা ও সরকারি নথিতে বছরভেদে ভিন্ন হিসাব পাওয়া যায়। একটি সরকারি প্রকল্পের নথিতে দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা ও ত্রাণ মন্ত্রণালয়ের তথ্য উদ্ধৃত করে বলা হয়েছে, ২০১১ থেকে ২০২০ সালের মধ্যে বজ্রপাতে ২,১৬৪ জনের মৃত্যু হয়েছিল। একই নথিতে বছরে গড়ে ২১৬ জন মৃত্যুর কথা উল্লেখ করা হয়েছে।
সোর্স: দূর্যোগ ব্যবস্থাপনা ও ত্রান মন্ত্রণালয়
এখানে একটি বিষয় মনে রাখা জরুরি। বজ্রপাতের মৃত্যুর হিসাব বিভিন্ন উৎসে এক নয়, কারণ সব ঘটনা একইভাবে নথিভুক্ত হয় না। তাই নির্দিষ্ট একটি সংখ্যা দিয়ে পুরো দেশের বর্তমান পরিস্থিতি বোঝানোর চেয়ে সরকারি উৎস ও সময়কাল উল্লেখ করে তথ্য ব্যবহার করাই বেশি নির্ভরযোগ্য।
বজ্রপাত কী?
বজ্রপাত হলো বায়ুমণ্ডলে সঞ্চিত বৈদ্যুতিক শক্তির অত্যন্ত দ্রুত ও শক্তিশালী নিঃসরণ। এটি একই মেঘের বিভিন্ন অংশের মধ্যে, দুটি মেঘের মধ্যে অথবা মেঘ ও মাটির মধ্যে ঘটতে পারে।
সহজভাবে বললে, বজ্রঝড়ের মেঘের মধ্যে বিভিন্ন ধরনের বৈদ্যুতিক চার্জ আলাদা হয়ে জমা হতে থাকে। যখন এই চার্জের পার্থক্য এত বেশি হয়ে যায় যে বাতাস আর বৈদ্যুতিক নিরোধক হিসেবে কাজ করতে পারে না, তখন হঠাৎ বিদ্যুৎ প্রবাহের একটি পথ তৈরি হয়। সেই বৈদ্যুতিক স্রাবই আমরা বজ্রপাত হিসেবে দেখতে পাই।
NASA-এর ব্যাখ্যা অনুযায়ী, বজ্রঝড়ের মেঘের মধ্যে বরফকণা, পানির কণা এবং অন্যান্য কণার সংঘর্ষ ও মেঘের ভেতরের শক্তিশালী ঊর্ধ্বমুখী ও নিম্নমুখী বায়ুপ্রবাহ বৈদ্যুতিক চার্জ আলাদা করতে ভূমিকা রাখে।
বজ্রপাত কেন হয়?
বজ্রপাত কেন হয়, তা বুঝতে হলে প্রথমে বজ্রঝড়ের মেঘ কীভাবে তৈরি হয় সেটি বোঝা দরকার।
উষ্ণ ও আর্দ্র বাতাস যখন দ্রুত উপরে উঠতে থাকে, তখন সেটি বায়ুমণ্ডলের অপেক্ষাকৃত ঠান্ডা স্তরে পৌঁছে ঠান্ডা হতে শুরু করে। জলীয়বাষ্প ঘনীভূত হয়ে পানির ক্ষুদ্র কণা তৈরি করে। শক্তিশালী বজ্রঝড়ের মেঘে একই সঙ্গে পানি, বরফকণা এবং শিলার মতো বরফজাত কণাও থাকতে পারে।
মেঘের ভেতরে শক্তিশালী ঊর্ধ্বমুখী ও নিম্নমুখী বায়ুপ্রবাহের কারণে এসব কণা একে অপরের সঙ্গে বারবার সংঘর্ষ করে। মেঘ কীভাবে তৈরি হয় এবং সেখান থেকে কীভাবে বৃষ্টি নামে, তা বুঝলে এই পুরো প্রক্রিয়াটি আরও সহজে বোঝা যায়।
NASA-এর তথ্য অনুযায়ী, বজ্রঝড়ের মেঘের ওপরের অংশ সাধারণত তুলনামূলকভাবে ধনাত্মক চার্জযুক্ত এবং নিচের অংশ তুলনামূলকভাবে ঋণাত্মক চার্জযুক্ত হয়ে উঠতে পারে। অর্থাৎ মেঘটি অনেকটা বিশাল একটি বৈদ্যুতিক ব্যাটারির মতো আচরণ করতে শুরু করে।
চার্জের পার্থক্য যত বাড়তে থাকে, বৈদ্যুতিক ক্ষেত্রও তত শক্তিশালী হয়। একপর্যায়ে বাতাসের নিরোধক ক্ষমতা ভেঙে যায় এবং বৈদ্যুতিক স্রাবের পথ তৈরি হয়। তখনই বজ্রপাত ঘটে।
বজ্রপাত কীভাবে সৃষ্টি হয়?
বজ্রপাত সৃষ্টি হওয়া একটি অত্যন্ত দ্রুত বৈদ্যুতিক প্রক্রিয়া। এর প্রতিটি ধাপ চোখে দেখা সম্ভব নয়, তবে বিজ্ঞানীরা পর্যবেক্ষণ ও পরিমাপের মাধ্যমে এর প্রক্রিয়া সম্পর্কে বিস্তারিত ধারণা পেয়েছেন।
প্রথমে বজ্রঝড়ের মেঘের মধ্যে কণা ও বরফের সংঘর্ষের মাধ্যমে চার্জ আলাদা হয়। এরপর মেঘের বিভিন্ন অংশে বিপরীত ধরনের চার্জের ঘনত্ব বাড়তে থাকে।
মেঘ ও মাটির মধ্যে বৈদ্যুতিক ক্ষেত্র যথেষ্ট শক্তিশালী হলে মেঘের ভেতর থেকে নিচের দিকে একটি আয়নিত পথ তৈরি হতে শুরু করে। একে stepped leader বলা হয়। একই সময়ে মাটির কাছ থেকে ধনাত্মক চার্জযুক্ত ছোট ছোট বৈদ্যুতিক পথ উপরের দিকে এগিয়ে যেতে পারে।
এই পথগুলো একে অপরের সঙ্গে যুক্ত হলে একটি পরিবাহী চ্যানেল তৈরি হয়। সেই চ্যানেল দিয়ে বিপুল পরিমাণ বৈদ্যুতিক শক্তি দ্রুত প্রবাহিত হয়। এটিই বজ্রপাতের উজ্জ্বল ঝলক হিসেবে দেখা যায়। NASA-এর lightning primer-এ এই প্রক্রিয়াটিকে charge separation, leader formation, streamer connection এবং return stroke-এর মাধ্যমে ব্যাখ্যা করা হয়েছে।
বজ্রপাতের সময় যে শব্দ হয়, সেটি কেন?
বজ্রপাতের সময় আমরা প্রথমে আলো দেখতে পাই এবং কিছুক্ষণ পর বজ্রের শব্দ শুনতে পাই। এর কারণ আলো শব্দের তুলনায় অনেক দ্রুত গতিতে আমাদের কাছে পৌঁছে।
বজ্রপাতের বৈদ্যুতিক স্রাবের কারণে আশপাশের বাতাস অত্যন্ত দ্রুত উত্তপ্ত ও প্রসারিত হয়। এর ফলে একটি শক্তিশালী চাপতরঙ্গ তৈরি হয়। সেই চাপতরঙ্গই পরে আমাদের কানে বজ্রধ্বনি হিসেবে পৌঁছায়। NASA জানিয়েছে, বজ্রপাতের চারপাশের বাতাস অত্যন্ত দ্রুত উত্তপ্ত হওয়ার ফলে তৈরি শক ওয়েভ থেকেই বজ্রধ্বনি সৃষ্টি হয়।
তাই বজ্রপাতের আলো দেখার পর বজ্রধ্বনি শুনতে কয়েক সেকেন্ড সময় লাগতে পারে। এই সময়ের পার্থক্য ব্যবহার করে ঝড় কতটা কাছে রয়েছে তার একটি আনুমানিক ধারণাও পাওয়া যায়।
বজ্রপাতের সময় কী করা উচিত?
বজ্রপাতের সময় সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো দ্রুত নিরাপদ আশ্রয়ে চলে যাওয়া। বাইরে বজ্রপাত শুরু হওয়ার পর নিরাপদ জায়গা খোঁজার চেয়ে বজ্রঝড় আসার আগেই আশ্রয়ের পরিকল্পনা করা আরও ভালো।
National Weather Service-এর lightning safety guidance অনুযায়ী, বজ্রধ্বনি শুনতে পাচ্ছেন মানে আপনি এমন দূরত্বের মধ্যে আছেন যেখানে বজ্রপাত আঘাত করতে পারে। তাই বজ্রের শব্দ শোনা মাত্র নিরাপদ আশ্রয়ে চলে যাওয়া উচিত।
নিরাপদ আশ্রয় বলতে শক্তভাবে নির্মিত বন্ধ ভবনকে বোঝায়। জানালা বন্ধ থাকা একটি ধাতব ছাদযুক্ত সম্পূর্ণ আবদ্ধ গাড়িও তুলনামূলকভাবে নিরাপদ আশ্রয় দিতে পারে। খোলা বারান্দা, ছোট শেড, পিকনিক শেল্টার বা খোলা গ্যারেজকে নিরাপদ আশ্রয় হিসেবে ধরা উচিত নয়।
ঘরের ভেতরে থাকলে বজ্রপাত থেকে কীভাবে নিরাপদ থাকবেন?
বাড়ির ভেতরে থাকা সাধারণত বাইরে থাকার তুলনায় অনেক নিরাপদ। তবে বজ্রপাতের সময় ঘরের ভেতরেও কিছু সতর্কতা প্রয়োজন।
জানালা ও দরজা থেকে দূরে থাকা উচিত। বৈদ্যুতিক তারের সঙ্গে সরাসরি সংযুক্ত যন্ত্রপাতি স্পর্শ না করাই ভালো। কর্ডযুক্ত টেলিফোন ব্যবহার করা উচিত নয়। একইভাবে বজ্রঝড়ের সময় কলের পানি, পাইপ, বেসিন, গোসলের পানি বা অন্য কোনো প্লাম্বিং ব্যবস্থার সঙ্গে অপ্রয়োজনীয় সংস্পর্শ এড়িয়ে চলা উচিত।
বজ্রপাতের সময় গোসল করা, কাপড় ধোয়া বা বাসন পরিষ্কার করার মতো পানির সঙ্গে সরাসরি সংযুক্ত কাজও এড়িয়ে চলা নিরাপদ।
একটি প্রচলিত ভুল ধারণা হলো, মোবাইল ফোন ব্যবহার করলেই বজ্রপাত আকৃষ্ট হয়। বিষয়টি এমন নয়। National Weather Service-এর নির্দেশনায় ঘরের ভেতরে cellular বা cordless phone ব্যবহারকে corded phone-এর মতো ঝুঁকিপূর্ণ বলা হয়নি। মূল বিষয় হলো আপনি যেন বাইরে না থাকেন এবং বিদ্যুৎ ও প্লাম্বিং ব্যবস্থার সরাসরি সংস্পর্শ এড়িয়ে চলেন।
বাইরে থাকলে বজ্রপাত থেকে বাঁচার উপায়
বাইরে অবস্থান করার সময় বজ্রপাত শুরু হলে সবচেয়ে ভালো সিদ্ধান্ত হলো যত দ্রুত সম্ভব নিরাপদ বন্ধ ভবন বা সম্পূর্ণ আবদ্ধ ধাতব ছাদযুক্ত গাড়িতে আশ্রয় নেওয়া।
খোলা মাঠ, ধানক্ষেত, নদীর পাড়, পুকুর, বিল বা অন্য কোনো খোলা জায়গায় অবস্থান করা ঝুঁকিপূর্ণ। একইভাবে উঁচু জায়গা, পাহাড়ের চূড়া, উঁচু গাছ বা একাকী দাঁড়িয়ে থাকা গাছের নিচে আশ্রয় নেওয়া উচিত নয়।
National Weather Service স্পষ্টভাবে জানিয়েছে, বজ্রঝড়ের সময় বাইরে কোনো স্থানকেই সম্পূর্ণ নিরাপদ বলা যায় না। গাছের নিচে দাঁড়ানোও নিরাপদ আশ্রয় নয়।
বজ্রপাতের সময় পানিতে থাকা বিশেষভাবে বিপজ্জনক। নদী, পুকুর, হাওর, বিল বা অন্য কোনো জলাশয়ে থাকলে যত দ্রুত সম্ভব পানি থেকে উঠে নিরাপদ আশ্রয়ে যেতে হবে।
মাছ ধরার সময় নৌকায় থাকা, কৃষিকাজের সময় খোলা মাঠে থাকা কিংবা রাস্তায় হাঁটার সময় বজ্রঝড় শুরু হলে দেরি না করে নিরাপদ জায়গায় যাওয়ার চেষ্টা করতে হবে।
বজ্রপাত থেকে বাঁচার ৩০-৩০ নিয়ম কী?
বজ্রপাতের নিরাপত্তা নিয়ে বহুল ব্যবহৃত একটি নির্দেশনা হলো ৩০-৩০ নিয়ম।
প্রথম ৩০ বলতে বোঝানো হয়, বজ্রপাতের আলো দেখা এবং বজ্রধ্বনি শোনার মধ্যে সময় ৩০ সেকেন্ড বা তার কম হলে ঝড়কে বিপজ্জনকভাবে কাছাকাছি ধরে নিয়ে দ্রুত আশ্রয় নিতে হবে।
দ্বিতীয় ৩০ হলো শেষ বজ্রধ্বনি শোনার পর অন্তত ৩০ মিনিট অপেক্ষা করা। এরপর পরিস্থিতি নিরাপদ হলে বাইরে যাওয়া উচিত। National Weather Service-ও বজ্রধ্বনি শোনার পর নিরাপদ আশ্রয়ে যাওয়ার এবং শেষ বজ্রধ্বনির পর অন্তত ৩০ মিনিট সেখানে থাকার পরামর্শ দেয়।
তবে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, ৩০ সেকেন্ড গণনা করার জন্য বজ্রপাতের অপেক্ষা না করে বজ্রধ্বনি শুনলেই আশ্রয়ে চলে যাওয়া। কারণ আপনি যদি বজ্রধ্বনি শুনতে পান, তাহলে ঝড় আপনার জন্য ইতিমধ্যে ঝুঁকিপূর্ণ দূরত্বে থাকতে পারে।
বজ্রপাত থেকে রক্ষা পেতে আধুনিক যন্ত্রপাতি ও প্রযুক্তি
বজ্রপাতের ঝুঁকি কমাতে বর্তমানে বিভিন্ন ধরনের আধুনিক প্রযুক্তি ব্যবহার করা হয়। এর মধ্যে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হলো Lightning Protection System বা বজ্রনিরোধক ব্যবস্থা। একটি পূর্ণাঙ্গ বজ্রনিরোধক ব্যবস্থার উদ্দেশ্য বজ্রপাতকে বন্ধ করা নয়; বরং বজ্রপাত ভবনে আঘাত করলে বৈদ্যুতিক শক্তিকে একটি নির্ধারিত ও নিরাপদ পথে মাটিতে পৌঁছে দেওয়া। National Weather Service-এর তথ্য অনুযায়ী, এ ধরনের ব্যবস্থায় Lightning Rod বা Air Terminal, conductive cable এবং grounding network একসঙ্গে কাজ করে।
বাড়ি, অফিস, কারখানা বা বড় স্থাপনার ক্ষেত্রে Lightning Rod ভবনের গুরুত্বপূর্ণ অংশকে সরাসরি বজ্রপাতের ক্ষতি থেকে সুরক্ষায় সাহায্য করতে পারে। তবে শুধু একটি রড স্থাপন করলেই সম্পূর্ণ নিরাপত্তা নিশ্চিত হয় না। সঠিকভাবে নকশা করা এবং সংযুক্ত Lightning Protection System প্রয়োজন।
বজ্রপাতের কারণে শুধু ভবন নয়, বৈদ্যুতিক ও ইলেকট্রনিক যন্ত্রপাতিও ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে। এ কারণে Surge Protection Device বা SPD ব্যবহার করা হয়। বজ্রপাতের ফলে বিদ্যুৎ বা ডেটা লাইনে হঠাৎ অতিরিক্ত বৈদ্যুতিক চাপ তৈরি হলে SPD সেই surge-এর প্রভাব কমিয়ে সংবেদনশীল যন্ত্রপাতিকে সুরক্ষায় সাহায্য করে। National Weather Service-এর নিজস্ব স্থাপনাগুলোর ক্ষেত্রেও বৈদ্যুতিক ও ইলেকট্রনিক সরঞ্জামকে lightning-induced surge থেকে সুরক্ষার জন্য SPD ব্যবহারের নির্দেশনা রয়েছে।
এখানে Earthing বা Grounding System-ও অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। বজ্রনিরোধক ব্যবস্থার মাধ্যমে ধরা পড়া বৈদ্যুতিক শক্তি নিরাপদে মাটিতে প্রবাহিত করার জন্য সঠিক grounding ব্যবস্থা প্রয়োজন। Lightning rod, conductor এবং grounding system সঠিকভাবে সংযুক্ত না থাকলে কাঙ্ক্ষিত সুরক্ষা পাওয়া নাও যেতে পারে।
আধুনিক প্রযুক্তির আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো Lightning Detection System। এসব প্রযুক্তি বজ্রপাত শনাক্ত করে কোনো নির্দিষ্ট এলাকা বা স্থাপনার কাছে বজ্রঝড়ের ঝুঁকি সম্পর্কে সতর্কতা দিতে পারে। বড় শিল্পপ্রতিষ্ঠান, বিমানবন্দর, ক্রীড়া স্থাপনা, খোলা মাঠে আয়োজিত অনুষ্ঠান কিংবা অন্যান্য ঝুঁকিপূর্ণ এলাকায় এ ধরনের সতর্কতা ব্যবস্থা মানুষের নিরাপত্তা বাড়াতে সহায়ক হতে পারে।
তবে একটি বিষয় পরিষ্কারভাবে মনে রাখা জরুরি: কোনো Lightning Rod বা আধুনিক যন্ত্র বজ্রপাতকে সম্পূর্ণভাবে বন্ধ করতে পারে না। এসব প্রযুক্তির মূল উদ্দেশ্য হলো বজ্রপাতের ক্ষয়ক্ষতি কমানো এবং বৈদ্যুতিক শক্তিকে তুলনামূলকভাবে নিরাপদ পথে পরিচালিত করা।
তাই বজ্রপাতপ্রবণ এলাকায় শুধু প্রযুক্তির ওপর নির্ভর না করে আবহাওয়ার সতর্কবার্তা অনুসরণ করা এবং বজ্রঝড়ের সময় নিরাপদ ভবনের ভেতরে আশ্রয় নেওয়াই সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ। National Weather Service-এর মূল নিরাপত্তা নির্দেশনাও হলো, বজ্রধ্বনি শুনলে বাইরে না থেকে নিরাপদ আশ্রয়ে চলে যাওয়া।
বজ্রপাতের সময় কোন কাজগুলো করা উচিত নয়?
বজ্রপাতের সময় গাছের নিচে দাঁড়ানো উচিত নয়। বিশেষ করে খোলা জায়গায় একাকী উঁচু গাছের নিচে দাঁড়ানো অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ।
পানিতে থাকা উচিত নয়। নদী, পুকুর, বিল বা অন্য কোনো জলাশয় থেকে দ্রুত বের হয়ে নিরাপদ স্থানে যেতে হবে।
বিদ্যুতের খুঁটি, তার, ধাতব বেড়া, রেলিং বা বড় ধাতব কাঠামোর কাছাকাছি থাকা এড়িয়ে চলতে হবে।
খোলা মাঠে দাঁড়িয়ে থাকা উচিত নয়। সম্ভব হলে দ্রুত একটি শক্তভাবে নির্মিত বন্ধ ভবনে আশ্রয় নিতে হবে।
ছোট খোলা শেড, টিনের খোলা ঘর, বারান্দা বা খোলা গ্যারেজকে নিরাপদ আশ্রয় মনে করা ঠিক নয়।
বজ্রপাত শুরু হওয়ার পর বাইরে দাঁড়িয়ে বৈদ্যুতিক যন্ত্রপাতি ব্যবহার করার চেয়ে আগে থেকেই নিরাপদ জায়গায় চলে যাওয়া অনেক বেশি গুরুত্বপূর্ণ।
বজ্রপাতের সময় শরীরে অস্বাভাবিক অনুভূতি হলে কী করবেন?
কখনো কখনো বজ্রপাতের ঠিক আগে কাছাকাছি বৈদ্যুতিক ক্ষেত্রের প্রভাবে শরীরে চুল দাঁড়িয়ে যাওয়ার মতো অনুভূতি হতে পারে। এমন পরিস্থিতিকে অত্যন্ত জরুরি সতর্কসংকেত হিসেবে দেখা উচিত।
যদি নিরাপদ ভবন বা গাড়িতে পৌঁছানোর কোনো সুযোগ না থাকে, তাহলে উঁচু জায়গা থেকে নেমে নিচু ও তুলনামূলক নিরাপদ স্থানে যাওয়ার চেষ্টা করতে হবে। মাটিতে পুরো শরীর সমানভাবে শুয়ে পড়া উচিত নয়, কারণ এতে মাটির মধ্য দিয়ে বৈদ্যুতিক প্রবাহের সংস্পর্শের ঝুঁকি বাড়তে পারে।
তবে মনে রাখতে হবে, বাইরে অবস্থান করে কোনো ভঙ্গিই বজ্রপাত থেকে নিশ্চিত নিরাপত্তা দেয় না। সবচেয়ে ভালো উপায় হলো ঝড়ের আগেই নিরাপদ আশ্রয়ে চলে যাওয়া।
বজ্রপাতের প্রচলিত কিছু ভুল ধারণা
বজ্রপাত নিয়ে মানুষের মধ্যে বেশ কিছু প্রচলিত ধারণা রয়েছে, যার কিছু বৈজ্ঞানিকভাবে সঠিক নয়।
অনেকে মনে করেন, মোবাইল ফোন বজ্রপাতকে নিজের দিকে টেনে নেয়। এটি সঠিক ধারণা নয়। মোবাইল ফোন নিজে বজ্রপাত আকর্ষণ করে—এমন সাধারণ দাবি বৈজ্ঞানিক নিরাপত্তা নির্দেশনার সঙ্গে মেলে না। বরং বাইরে থাকাটাই বড় ঝুঁকি। ঘরের ভেতরে থাকলে মোবাইল ফোন ব্যবহার করার চেয়ে নিরাপদ আশ্রয়ে থাকা এবং বিদ্যুৎ ও প্লাম্বিংয়ের সরাসরি সংস্পর্শ এড়িয়ে চলা গুরুত্বপূর্ণ।
আরেকটি ভুল ধারণা হলো, গাছের নিচে দাঁড়ালে বৃষ্টি থেকে নিরাপদ থাকা যাবে এবং বজ্রপাতের ঝুঁকি কমবে। বাস্তবে উঁচু গাছ বজ্রপাতের ঝুঁকি তৈরি করতে পারে। তাই বজ্রপাতের সময় গাছের নিচে আশ্রয় নেওয়া উচিত নয়।
কেউ কেউ মনে করেন, রাবারের জুতা পরলে বজ্রপাত থেকে পুরোপুরি নিরাপদ থাকা যায়। এটিও নির্ভরযোগ্য নিরাপত্তা ব্যবস্থা নয়। বজ্রপাতের শক্তি এত বেশি যে সাধারণ জুতাকে ভরসা করে বাইরে থাকা নিরাপদ সিদ্ধান্ত নয়।
বজ্রপাতের শিকার ব্যক্তিকে স্পর্শ করা কি নিরাপদ?
কোনো ব্যক্তি বজ্রপাতে আক্রান্ত হলে তাকে সাহায্য করতে ভয় পাওয়ার প্রয়োজন নেই। বজ্রপাতে আক্রান্ত ব্যক্তি শরীরে বৈদ্যুতিক চার্জ ধরে রাখেন না এবং তাকে স্পর্শ করা নিরাপদ। National Weather Service-এর নির্দেশনাতেও এ বিষয়টি উল্লেখ করা হয়েছে।
তবে বজ্রপাতে আক্রান্ত ব্যক্তির দ্রুত চিকিৎসা সহায়তা প্রয়োজন হতে পারে। শ্বাস-প্রশ্বাস বন্ধ হয়ে গেলে প্রশিক্ষণ থাকলে CPR শুরু করা এবং দ্রুত জরুরি চিকিৎসা সহায়তা নেওয়া গুরুত্বপূর্ণ।
একই সঙ্গে আশপাশে এখনও বজ্রপাতের ঝুঁকি থাকলে উদ্ধারকারী নিজে যেন বিপদের মধ্যে না পড়েন, সেটিও নিশ্চিত করতে হবে। প্রথমে নিজের নিরাপত্তা, তারপর আহত ব্যক্তিকে সহায়তা করা উচিত।
বজ্রপাতের ঝুঁকি কমাতে আগেই কী প্রস্তুতি নেওয়া যায়?
বজ্রপাত থেকে নিরাপদ থাকার সবচেয়ে কার্যকর কৌশল হলো ঝড় শুরু হওয়ার আগেই প্রস্তুত থাকা।
আবহাওয়ার পূর্বাভাস ও স্থানীয় সতর্কবার্তার দিকে নজর রাখা উচিত। যারা নিয়মিত কৃষিকাজ, মাছ ধরা, নৌযাত্রা বা বাইরে কাজ করেন, তাদের আগে থেকেই কাছাকাছি নিরাপদ আশ্রয়ের জায়গা সম্পর্কে জানা থাকা দরকার।
বাড়িতে বৈদ্যুতিক নিরাপত্তা ব্যবস্থাও গুরুত্বপূর্ণ। বৈদ্যুতিক সংযোগ সঠিকভাবে স্থাপন করা, প্রয়োজনীয় আর্থিং ব্যবস্থা রাখা এবং ভবনের জন্য উপযুক্ত lightning protection বা বজ্রনিরোধক ব্যবস্থা নিয়ে বিশেষজ্ঞের পরামর্শ নেওয়া যেতে পারে।
বজ্রনিরোধক ব্যবস্থা ভবনের কাঠামো ও বৈদ্যুতিক সুরক্ষার একটি বিষয়। এটি এমনভাবে নকশা ও স্থাপন করা প্রয়োজন যাতে বজ্রপাতের বৈদ্যুতিক শক্তি নিরাপদ পথে মাটিতে পৌঁছাতে পারে। এ ধরনের ব্যবস্থা স্থাপনের ক্ষেত্রে যোগ্য প্রকৌশলী বা সংশ্লিষ্ট বিশেষজ্ঞের পরামর্শ নেওয়া উচিত।
বজ্রপাত সম্পর্কে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ কথা
বজ্রপাত একটি প্রাকৃতিক বৈদ্যুতিক ঘটনা, কিন্তু এর ঝুঁকি অনেকটাই মানুষের আচরণের ওপর নির্ভর করে কমানো সম্ভব।
বজ্রধ্বনি শুনলে বাইরে থাকা বন্ধ করে নিরাপদ আশ্রয়ে যেতে হবে। গাছের নিচে, খোলা মাঠে, উঁচু জায়গায় বা পানির কাছে থাকা যাবে না। ঘরের ভেতরে থাকলে জানালা, দরজা, প্লাম্বিং এবং সরাসরি বৈদ্যুতিক সংযোগযুক্ত যন্ত্রপাতি থেকে দূরে থাকা ভালো।
সবচেয়ে সহজ নিয়মটি মনে রাখা যায় এভাবে: বজ্রধ্বনি শুনলে বাইরে নয়, নিরাপদ আশ্রয়ের ভেতরে যেতে হবে। শেষ বজ্রধ্বনি শোনার পরও অন্তত ৩০ মিনিট অপেক্ষা করে তারপর বাইরে বের হওয়া উচিত।
বাংলাদেশের মতো দেশে যেখানে বহু মানুষ কৃষিকাজ ও অন্যান্য পেশায় দীর্ঘ সময় খোলা জায়গায় থাকেন, সেখানে বজ্রপাত সম্পর্কে সঠিক বৈজ্ঞানিক জ্ঞান শুধু একটি সাধারণ তথ্য নয়; এটি জীবন রক্ষার জ্ঞান। তাই বজ্রপাত কেন হয় তা জানার পাশাপাশি বজ্রপাত থেকে বাঁচার উপায়গুলো বাস্তবে মেনে চলাই সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ।
সংক্ষেপে মনে রাখুন
বজ্রপাত হয় মূলত বজ্রঝড়ের মেঘের মধ্যে বৈদ্যুতিক চার্জের বিভাজন ও শক্তিশালী বৈদ্যুতিক ক্ষেত্র তৈরির কারণে।
বজ্রধ্বনি শুনতে পেলেই নিরাপদ আশ্রয়ে যেতে হবে।
গাছের নিচে, খোলা মাঠে, উঁচু জায়গায় বা পানির কাছে থাকা যাবে না।
নিরাপদ আশ্রয় হিসেবে শক্তভাবে নির্মিত বন্ধ ভবন বা জানালা বন্ধ থাকা সম্পূর্ণ আবদ্ধ ধাতব ছাদযুক্ত গাড়িকে বেছে নেওয়া ভালো।
বজ্রপাতের সময় কর্ডযুক্ত ফোন, বৈদ্যুতিক যন্ত্রপাতি ও প্লাম্বিংয়ের সরাসরি সংস্পর্শ এড়িয়ে চলতে হবে।
শেষ বজ্রধ্বনি শোনার পর অন্তত ৩০ মিনিট অপেক্ষা করে বাইরে বের হওয়া উচিত।
বজ্রপাতে আক্রান্ত ব্যক্তিকে সাহায্য করা নিরাপদ, কারণ আক্রান্ত ব্যক্তি শরীরে বৈদ্যুতিক চার্জ ধরে রাখেন না। তবে দ্রুত চিকিৎসা সহায়তা নেওয়া জরুরি।
সবশেষে, বজ্রপাতের সময় দ্রুত সিদ্ধান্ত নেওয়াই সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ। আকাশে বিদ্যুৎ চমকানো দেখলে বা বজ্রের শব্দ শুনলে ঝুঁকি নিয়ে বাইরে না থেকে নিরাপদ আশ্রয়ে চলে যান। কয়েক মিনিটের সতর্কতা একটি জীবন বাঁচাতে পারে।
FAQ
বজ্রপাতের সময় গাছের নিচে দাঁড়ানো কি নিরাপদ?
না। বজ্রপাতের সময় গাছের নিচে দাঁড়ানো বিপজ্জনক। উঁচু গাছে বজ্রপাত হলে আশপাশের মানুষও বৈদ্যুতিক স্রাবের শিকার হতে পারেন।
বজ্রপাত থেকে বাঁচার সবচেয়ে নিরাপদ উপায় কী?
বজ্রপাতের সময় নিরাপদ ভবনের ভেতরে থাকা সবচেয়ে ভালো। বাইরে থাকলে দ্রুত আশ্রয় নেওয়া এবং বজ্রপাতের ঝুঁকি শেষ না হওয়া পর্যন্ত বাইরে না বের হওয়া উচিত।
বজ্রপাতের সময় ঘরের বাইরে থাকলে কী করা উচিত?
দ্রুত কোনো নিরাপদ, বন্ধ ভবনের ভেতরে আশ্রয় নেওয়া উচিত। খোলা মাঠ, উঁচু জায়গা, গাছের নিচে বা পানির কাছাকাছি থাকা এড়িয়ে চলুন।
বজ্রপাত কেন হয়?
মেঘের ভেতরে বরফকণা ও পানির কণার সংঘর্ষের ফলে বৈদ্যুতিক চার্জের বিভাজন ঘটে। চার্জের পার্থক্য অনেক বেড়ে গেলে হঠাৎ বৈদ্যুতিক স্রাব হয়, যাকে আমরা বজ্রপাত বলি।
