ভূমিকম্পের কথা শুনলেই আমাদের অনেকের মনে হঠাৎ আতঙ্কের একটা ছবি ভেসে ওঠে। মাটির নিচ থেকে আসা সেই অদৃশ্য কম্পন কয়েক সেকেন্ডের মধ্যেই ঘরবাড়ি কাঁপিয়ে দিতে পারে, আসবাবপত্র নড়তে শুরু করে, আর মানুষ বুঝে ওঠার আগেই চারপাশে তৈরি হয় ভয় ও অনিশ্চয়তা। কিন্তু এই ভয়ংকর ঘটনাটির পেছনে আসলে কী ঘটে? কেন আমাদের পায়ের নিচের শক্ত মাটি হঠাৎ কেঁপে ওঠে?
পৃথিবীকে বাইরে থেকে যতটা স্থির মনে হয়, ভেতরে কিন্তু সে ততটা শান্ত নয়। পৃথিবীর গভীরে প্রতিনিয়ত তাপ, চাপ ও বিভিন্ন ভূতাত্ত্বিক পরিবর্তনের প্রভাব কাজ করছে। পৃথিবীর ওপরের শক্ত স্তরটি কয়েকটি বিশাল টেকটোনিক প্লেটে বিভক্ত, যেগুলো অত্যন্ত ধীর গতিতে সবসময়ই নড়াচড়া করছে। কখনো এই প্লেটগুলো একে অপরের দিকে এগিয়ে আসে, কখনো দূরে সরে যায়, আবার কখনো পাশাপাশি ঘষে এগিয়ে যায়। দীর্ঘ সময় ধরে জমে থাকা এই শক্তি কোনো একসময় হঠাৎ মুক্ত হয়ে গেলে সৃষ্টি হতে পারে ভূমিকম্প।
ভূমিকম্প শুধু মাটি কাঁপিয়ে থেমে যায় না। এর প্রভাব মানুষের জীবন, ঘরবাড়ি, রাস্তা, সেতু, বিদ্যুৎ ও যোগাযোগব্যবস্থার ওপরও পড়তে পারে। শক্তিশালী ভূমিকম্পের পর কোথাও ধসে যেতে পারে ভবন, কোথাও দেখা দিতে পারে ভূমিধস, আবার সমুদ্রের তলদেশে বড় ধরনের ভূমিকম্প হলে তৈরি হতে পারে সুনামিও। তাই ভূমিকম্প সম্পর্কে জানা মানে শুধু একটি প্রাকৃতিক ঘটনা সম্পর্কে জানা নয়; বরং বিপদের মুহূর্তে নিজেকে এবং আশপাশের মানুষকে নিরাপদ রাখার প্রস্তুতি নেওয়া।
তবে ভূমিকম্প নিয়ে মানুষের জ্ঞানও থেমে নেই। বিজ্ঞানীরা এখন অত্যাধুনিক সেন্সর, স্যাটেলাইট, কম্পন শনাক্তকারী যন্ত্র এবং দ্রুত সতর্কবার্তা প্রযুক্তির সাহায্যে ভূমিকম্পের ঝুঁকি বুঝতে ও কিছু ক্ষেত্রে কম্পন পৌঁছানোর আগেই সতর্কবার্তা দেওয়ার চেষ্টা করছেন। ভূমিকম্প কখন ঠিক কোথায় এবং কত শক্তিশালী হবে তা নির্ভুলভাবে আগে থেকে বলে দেওয়া এখনো সম্ভব নয়, কিন্তু বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি মানুষের ক্ষয়ক্ষতি কমানোর নতুন নতুন পথ তৈরি করছে।
এই লেখায় আমরা জানব ভূমিকম্প আসলে কী, কেন হয়, পৃথিবীর ভেতরে কী ধরনের পরিবর্তনের কারণে এর সৃষ্টি হয়, এর প্রভাব কতটা ভয়াবহ হতে পারে এবং ভূমিকম্পের আগে, চলাকালীন ও পরে কীভাবে নিরাপদ থাকা যায়। সহজ ভাষায় পুরো বিষয়টি বুঝে নেওয়ার চেষ্টা থাকবে, যাতে ভূমিকম্পের মতো ভয়ংকর একটি প্রাকৃতিক ঘটনাকে শুধু আতঙ্কের চোখে নয়, বরং জ্ঞান ও সচেতনতার চোখেও দেখা যায়।
ভূমিকম্প কী ?
ভূমিকম্প হলো পৃথিবীর ভূপৃষ্ঠ বা ভূগর্ভের কোনো অংশে হঠাৎ সৃষ্ট কম্পন। সহজভাবে বললে, মাটির নিচে দীর্ঘ সময় ধরে জমে থাকা শক্তি যখন হঠাৎ কোনো কারণে মুক্ত হয়ে যায়, তখন সেই শক্তি তরঙ্গের মতো চারদিকে ছড়িয়ে পড়ে এবং আমরা ভূপৃষ্ঠে কাঁপুনি অনুভব করি। এই কাঁপুনিকেই ভূমিকম্প বলা হয়।
আমাদের চারপাশের মাটি, রাস্তা, ভবন বা পাহাড়কে স্থির মনে হলেও পৃথিবীর ভেতরের অংশ সবসময় পুরোপুরি স্থির নয়। পৃথিবীর বাইরের শক্ত স্তরটি বিশাল কয়েকটি টেকটোনিক প্লেটে বিভক্ত। এসব প্লেট খুব ধীরে ধীরে নড়াচড়া করে। কখনো দুটি প্লেট একে অপরের দিকে এগিয়ে আসে, কখনো দূরে সরে যায়, আবার কখনো পাশাপাশি ঘর্ষণের মাধ্যমে এগিয়ে চলে। এই নড়াচড়ার সময় ভূগর্ভের বিভিন্ন শিলাস্তরে প্রচণ্ড চাপ তৈরি হতে পারে।
শিলাস্তর সবসময় সেই চাপ সহ্য করতে পারে না। কোনো একটি দুর্বল অংশে বা ভূগর্ভের ফাটল বরাবর জমে থাকা চাপ হঠাৎ মুক্ত হলে শিলাস্তর দ্রুত সরে যেতে পারে। তখন যে শক্তি উৎপন্ন হয়, তা ভূমিকম্পীয় তরঙ্গ হিসেবে চারদিকে ছড়িয়ে পড়ে। এই তরঙ্গ যখন ভূপৃষ্ঠে পৌঁছায়, তখন মাটি কাঁপতে শুরু করে।
ভূমিকম্পের উৎপত্তিস্থল সাধারণত মাটির অনেক গভীরে থাকে। ভূগর্ভের যে স্থান থেকে ভূমিকম্পের কম্পন বা শক্তির উৎপত্তি হয়, তাকে বলা হয় ভূমিকম্পের কেন্দ্র বা ফোকাস। এই কেন্দ্রের ঠিক ওপরে ভূপৃষ্ঠের যে স্থানটি অবস্থিত, সেটিকে বলা হয় উপকেন্দ্র বা এপিসেন্টার। উপকেন্দ্রের কাছাকাছি এলাকায় অনেক সময় ভূমিকম্পের কম্পন বেশি অনুভূত হতে পারে।
ভূমিকম্পের কম্পন সবসময় একই রকম হয় না। কোনো কোনো ভূমিকম্প এত দুর্বল হয় যে মানুষ তা টেরই পায় না, কিন্তু সংবেদনশীল যন্ত্রে তার কম্পন ধরা পড়ে। আবার শক্তিশালী ভূমিকম্প কয়েক সেকেন্ড বা তার বেশি সময় ধরে তীব্রভাবে মাটি কাঁপিয়ে বড় ধরনের ক্ষয়ক্ষতি ঘটাতে পারে।
ভূমিকম্পের সময় মাটির যে কাঁপুনি আমরা অনুভব করি, সেটি মূলত ভূমিকম্পীয় তরঙ্গের কারণে। এই তরঙ্গ ভূগর্ভের শিলা এবং ভূপৃষ্ঠের মধ্য দিয়ে বিভিন্ন দিকে ছড়িয়ে পড়ে। ভূমিকম্প কতটা শক্তিশালী হবে, কোথায় উৎপত্তি হয়েছে, কত গভীরে হয়েছে এবং ওই এলাকার মাটির ধরন কেমন—এসব বিষয়ের ওপর কাঁপুনির তীব্রতা ও ক্ষয়ক্ষতির পরিমাণ অনেকটাই নির্ভর করে।
তাই ভূমিকম্পকে শুধু ‘মাটি কাঁপা’ বললে পুরো বিষয়টি বোঝা যায় না। এর পেছনে রয়েছে পৃথিবীর অভ্যন্তরের বিশাল ভূতাত্ত্বিক প্রক্রিয়া, টেকটোনিক প্লেটের নড়াচড়া এবং দীর্ঘ সময় ধরে জমে থাকা শক্তির হঠাৎ মুক্তি। আর এই প্রক্রিয়াটি কীভাবে ঘটে, সেটি বুঝতে হলে প্রথমে জানতে হবে পৃথিবীর টেকটোনিক প্লেটগুলো কী এবং তারা কীভাবে নড়াচড়া করে।
ভূমিকম্প কেন হয়?
ভূমিকম্প হঠাৎ করে কোনো কারণ ছাড়াই ঘটে না। এর পেছনে থাকে পৃথিবীর অভ্যন্তরে চলতে থাকা দীর্ঘমেয়াদি ভূতাত্ত্বিক পরিবর্তন। পৃথিবীর ভেতরে প্রচণ্ড তাপ ও চাপের কারণে এর ওপরের শক্ত স্তরের বিশাল অংশগুলো খুব ধীরে ধীরে নড়াচড়া করে। এই নড়াচড়ার ফলে কোথাও চাপ জমতে থাকে, কোথাও শিলাস্তরে টান তৈরি হয়, আবার কোথাও দুটি শিলাস্তর একে অপরের সঙ্গে আটকে থাকে। দীর্ঘ সময় ধরে জমে থাকা সেই শক্তি যখন হঠাৎ মুক্ত হয়ে যায়, তখনই ভূমিকম্পের সৃষ্টি হতে পারে।
টেকটোনিক প্লেট কী?
পৃথিবীর একেবারে বাইরের শক্ত স্তরকে লিথোস্ফিয়ার বলা হয়। এই শক্ত স্তরটি একটি একটানা খণ্ড নয়; বরং এটি অনেকগুলো বিশাল ও শক্ত প্লেটে বিভক্ত। এসব বিশাল খণ্ডকেই বলা হয় টেকটোনিক প্লেট।
এই প্লেটগুলো পৃথিবীর ভূপৃষ্ঠের ওপর স্থির হয়ে পড়ে নেই। এগুলো অত্যন্ত ধীর গতিতে ক্রমাগত নড়াচড়া করছে। মানুষের কাছে এই গতি প্রায় বোঝাই যায় না, কারণ সাধারণত একটি প্লেট বছরে কয়েক সেন্টিমিটার বা তার কাছাকাছি গতিতে সরে যায়। কিন্তু এই সামান্য নড়াচড়াই হাজার হাজার বা লাখ লাখ বছর ধরে চলতে থাকলে পৃথিবীর মানচিত্রে বড় ধরনের পরিবর্তন ঘটাতে পারে।
টেকটোনিক প্লেটের নিচে তুলনামূলকভাবে উত্তপ্ত ও ধীরে প্রবাহমান একটি স্তর রয়েছে, যাকে অ্যাস্থেনোস্ফিয়ার বলা হয়। এর ওপর দিয়ে প্লেটগুলো খুব ধীরে সরে যেতে পারে। পৃথিবীর অভ্যন্তরের তাপ, ম্যান্টলের পদার্থের চলাচল এবং প্লেটের নিজস্ব গতিশীলতার কারণে এই নড়াচড়া ঘটে।
প্লেটগুলোর সীমানায় সবচেয়ে বেশি ভূতাত্ত্বিক পরিবর্তন দেখা যায়। কোথাও দুটি প্লেট একে অপরের দিকে এগিয়ে আসে, কোথাও তারা পরস্পর থেকে দূরে সরে যায়, আবার কোথাও দুটি প্লেট পাশাপাশি বিপরীত দিকে সরে যায়। এসব সীমান্ত এলাকায় দীর্ঘ সময় ধরে প্রচণ্ড চাপ জমতে পারে এবং সেখান থেকেই অনেক শক্তিশালী ভূমিকম্পের সৃষ্টি হয়।
প্লেটের নড়াচড়ায় ভূমিকম্প কীভাবে সৃষ্টি হয়?
টেকটোনিক প্লেটের নড়াচড়া খুব ধীর হলেও এর প্রভাব অনেক গভীর। দুটি প্লেট যখন একে অপরের সঙ্গে ধাক্কা খায় বা পাশাপাশি সরে যেতে চায়, তখন তাদের মধ্যকার শিলাস্তরে প্রচণ্ড চাপ তৈরি হতে থাকে। কিন্তু শিলাস্তর সবসময় সঙ্গে সঙ্গে নড়ে যায় না। অনেক সময় ঘর্ষণের কারণে দুটি অংশ আটকে থাকে।
ভাবুন, দুটি শক্ত পাথরের টুকরোকে পাশাপাশি রেখে একটি আরেকটির ওপর দিয়ে সরানোর চেষ্টা করা হচ্ছে। শুরুতে এগুলো ঘর্ষণের কারণে আটকে থাকতে পারে। কিন্তু আপনি চাপ দিতে থাকলে একসময় সেই চাপ এত বেশি হয়ে যায় যে পাথর হঠাৎ পিছলে যায়। ভূগর্ভে অনেকটা এমনই একটি ঘটনা ঘটতে পারে।
ভূগর্ভের কোনো ফাটল বা দুর্বল অংশে দীর্ঘ সময় ধরে চাপ জমতে জমতে একপর্যায়ে শিলাস্তর হঠাৎ সরে গেলে সেখানে সঞ্চিত শক্তি মুক্ত হয়। সেই শক্তি ভূমিকম্পীয় তরঙ্গ হিসেবে চারদিকে ছড়িয়ে পড়ে। তরঙ্গ ভূপৃষ্ঠে পৌঁছালে আমরা মাটি কাঁপতে দেখি বা অনুভব করি।
যে ফাটল বা দুর্বল অঞ্চল বরাবর শিলাস্তর একে অপরের তুলনায় সরে যায়, তাকে ফল্ট বা ভূ-চ্যুতি বলা হয়। সব ফল্টে সবসময় ভূমিকম্প হয় না, তবে সক্রিয় ফল্টে দীর্ঘ সময় ধরে জমে থাকা চাপ হঠাৎ মুক্ত হলে শক্তিশালী ভূমিকম্প ঘটতে পারে।
ভূমিকম্পের শক্তি যত বেশি হবে, সাধারণত তার প্রভাবও তত বেশি হতে পারে। তবে শুধু ভূমিকম্পের শক্তি দিয়ে ক্ষয়ক্ষতি নির্ধারণ করা যায় না। ভূমিকম্প কত গভীরে হয়েছে, উপকেন্দ্র থেকে কোনো এলাকা কত দূরে, সেখানকার মাটির ধরন কেমন এবং ভবনগুলো কতটা শক্ত—এসব বিষয়ও ক্ষয়ক্ষতির ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে।
ভূমিকম্পের কেন্দ্র ও উপকেন্দ্র কী?
ভূমিকম্পের উৎপত্তি বুঝতে দুটি গুরুত্বপূর্ণ শব্দ জানা দরকার—কেন্দ্র বা ফোকাস এবং উপকেন্দ্র বা এপিসেন্টার।
ভূগর্ভের যে নির্দিষ্ট স্থান থেকে ভূমিকম্পের শক্তি প্রথম মুক্ত হয়, সেটিকে ভূমিকম্পের কেন্দ্র বা ফোকাস বলা হয়। এটি সাধারণত ভূপৃষ্ঠের অনেক নিচে অবস্থান করে। এই স্থান থেকেই ভূমিকম্পীয় তরঙ্গ বিভিন্ন দিকে ছড়িয়ে পড়তে শুরু করে।
অন্যদিকে, ভূমিকম্পের কেন্দ্রের ঠিক উল্লম্বভাবে ওপরে ভূপৃষ্ঠে যে স্থানটি থাকে, সেটিকে উপকেন্দ্র বা এপিসেন্টার বলা হয়। সহজভাবে মনে রাখলে, ভূমিকম্পের কেন্দ্র হলো মাটির নিচের উৎপত্তিস্থল আর উপকেন্দ্র হলো তার ঠিক ওপরের ভূপৃষ্ঠের স্থান।
উপকেন্দ্রের কাছাকাছি এলাকায় অনেক সময় ভূমিকম্পের কাঁপুনি বেশি অনুভূত হতে পারে। তবে এর অর্থ এই নয় যে উপকেন্দ্র থেকে দূরে গেলে সবসময় ক্ষতি কম হবে। ভূমিকম্পের গভীরতা, মাটির প্রকৃতি, ভূমিকম্পের তরঙ্গের ধরন এবং স্থানীয় ভবন ও অবকাঠামোর মান—সবকিছু মিলিয়েই কোনো এলাকায় প্রকৃত প্রভাব নির্ধারিত হয়।
ভূমিকম্পের কেন্দ্র ও উপকেন্দ্র সম্পর্কে ধারণা থাকা বিজ্ঞানীদের জন্যও অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। বিভিন্ন স্থানে থাকা সিসমোমিটার বা ভূকম্পন মাপার যন্ত্রে পৌঁছানো তরঙ্গ বিশ্লেষণ করে বিজ্ঞানীরা ভূমিকম্পের অবস্থান, গভীরতা এবং অন্যান্য বৈশিষ্ট্য নির্ণয় করতে পারেন।
আধুনিক প্রযুক্তির কারণে এখন ভূমিকম্প শনাক্ত করার সক্ষমতা আগের তুলনায় অনেক উন্নত হয়েছে। বিশ্বজুড়ে স্থাপন করা সেন্সর ও ভূকম্পন পর্যবেক্ষণ নেটওয়ার্ক খুব দ্রুত কম্পন শনাক্ত করতে পারে। কিছু অঞ্চলে দ্রুত সতর্কবার্তা ব্যবস্থাও রয়েছে, যেখানে শক্তিশালী কম্পনের কিছু তরঙ্গ শনাক্ত হওয়ার পর ক্ষতিকর কম্পন পৌঁছানোর আগেই মানুষকে সতর্ক করার চেষ্টা করা হয়। তবে এই প্রযুক্তি ভূমিকম্প আগে থেকে ভবিষ্যদ্বাণী করে না; বরং ভূমিকম্প শুরু হওয়ার পর যত দ্রুত সম্ভব সতর্কবার্তা দেওয়ার কাজে ব্যবহৃত হয়।
ভূমিকম্পের প্রধান কারণ
ভূমিকম্পের সবচেয়ে বড় কারণ হলো পৃথিবীর ভূত্বকের নিচে থাকা টেকটোনিক প্লেটগুলোর নড়াচড়া। তবে সব ভূমিকম্প একই কারণে হয় না। কোথাও প্লেটের সংঘর্ষ ও ঘর্ষণের কারণে ভূমিকম্প সৃষ্টি হয়, কোথাও প্লেট একে অপরের থেকে দূরে সরে যাওয়ার কারণে, আবার কিছু ভূমিকম্প আগ্নেয়গিরির কার্যকলাপ বা মানুষের বিভিন্ন কর্মকাণ্ডের সঙ্গেও সম্পর্কিত। নিচে ভূমিকম্পের প্রধান কারণগুলো সহজভাবে তুলে ধরা হলো।
টেকটোনিক প্লেটের সংঘর্ষ
টেকটোনিক প্লেটের সংঘর্ষ ভূমিকম্পের অন্যতম প্রধান কারণ। পৃথিবীর বিশাল প্লেটগুলো যখন একে অপরের দিকে এগিয়ে আসে, তখন তাদের সীমানায় প্রচণ্ড চাপ তৈরি হয়। অনেক সময় একটি প্লেট অন্যটির নিচে ঢুকে যেতে পারে। এই প্রক্রিয়াকে সাবডাকশন বলা হয়।
আবার দুটি মহাদেশীয় প্লেট পরস্পরের দিকে এগিয়ে এলে তারা একে অপরের সঙ্গে ধাক্কা খেতে পারে। এতে শিলাস্তরে প্রচণ্ড চাপ জমে এবং ভূগর্ভের বিভিন্ন অংশ বিকৃত হতে থাকে। দীর্ঘ সময় ধরে এই চাপ জমার পর কোনো দুর্বল অংশ হঠাৎ ভেঙে বা সরে গেলে বিপুল শক্তি মুক্ত হয়। তখন সৃষ্টি হতে পারে শক্তিশালী ভূমিকম্প।
পৃথিবীর অনেক বড় ভূমিকম্প এমন প্লেট সীমান্তের আশপাশেই ঘটে। বিশেষ করে যেসব অঞ্চলে একটি প্লেট অন্য একটি প্লেটের নিচে ঢুকে যাচ্ছে, সেখানে বড় ধরনের ভূমিকম্পের পাশাপাশি বজ্রপাত বা সুনামির ঝুঁকিও থাকতে পারে।
প্লেটের বিচ্যুতি
দুটি টেকটোনিক প্লেট যখন একে অপরের কাছ থেকে দূরে সরে যায়, তখনও ভূমিকম্প হতে পারে। প্লেট দুটির মাঝখানে ফাঁক তৈরি হলে পৃথিবীর অভ্যন্তর থেকে গরম ম্যাগমা ওপরে উঠে এসে নতুন ভূত্বক তৈরি করতে পারে।
এই প্রক্রিয়ায় ভূত্বকের শিলাস্তরে টান ও ফাটল তৈরি হয়। ফাটলের আশপাশে শিলাস্তর হঠাৎ সরে গেলে ভূমিকম্পীয় তরঙ্গ সৃষ্টি হতে পারে।
প্লেটের বিচ্যুতির কারণে সৃষ্ট ভূমিকম্প অনেক সময় সমুদ্রের তলদেশের মধ্যবর্তী পর্বতমালা বা রিফট অঞ্চলে দেখা যায়। এসব ভূমিকম্প সাধারণত প্লেটের সংঘর্ষজনিত কিছু বৃহৎ ভূমিকম্পের তুলনায় ভিন্ন ধরনের ভূতাত্ত্বিক পরিবেশে ঘটে।
আগ্নেয়গিরির অগ্ন্যুৎপাত
অগ্নেয়গিরির কার্যকলাপের কারণেও ভূমিকম্প হতে পারে। পৃথিবীর গভীরে থাকা ম্যাগমা যখন ওপরে ওঠার চেষ্টা করে, তখন আশপাশের শিলাস্তরে চাপ সৃষ্টি হয়। এই চাপের কারণে ছোট ছোট ফাটল তৈরি হতে পারে এবং শিলাস্তর সরে গিয়ে কম্পন সৃষ্টি করতে পারে।
অগ্নেয়গিরির আশপাশে এ ধরনের কম্পনকে অনেক সময় আগ্নেয়গিরিজনিত ভূমিকম্প বলা হয়। কোনো কোনো ক্ষেত্রে অগ্ন্যুৎপাতের আগে ভূগর্ভে ছোট ছোট কম্পনের সংখ্যা বাড়তে পারে। তাই বিজ্ঞানীরা সক্রিয় আগ্নেয়গিরির আশপাশের ভূমিকম্পের তথ্য পর্যবেক্ষণ করেন।
তবে মনে রাখা দরকার, পৃথিবীর অধিকাংশ ভূমিকম্প আগ্নেয়গিরির কারণে হয় না। বেশিরভাগ ভূমিকম্পের মূল কারণ টেকটোনিক প্লেটের নড়াচড়া এবং ভূগর্ভের ফল্ট বরাবর সঞ্চিত শক্তির হঠাৎ মুক্তি।
মানুষের কর্মকাণ্ড
প্রাকৃতিক কারণের পাশাপাশি মানুষের কিছু কর্মকাণ্ডের সঙ্গেও ভূমিকম্পের সম্পর্ক থাকতে পারে। মানুষের তৈরি কিছু বড় প্রকল্প বা ভূগর্ভে বিভিন্ন ধরনের কার্যক্রমের কারণে ভূগর্ভের চাপ ও তরলের ভারসাম্যে পরিবর্তন ঘটলে কিছু এলাকায় ভূমিকম্পের ঝুঁকি বাড়তে পারে।
উদাহরণ হিসেবে বড় জলাধারে বিপুল পরিমাণ পানি জমা, গভীর ভূগর্ভে তরল প্রবেশ করানো, খনিজ বা তেল-গ্যাস উত্তোলন এবং কিছু ধরনের ভূগর্ভস্থ শিল্প কার্যক্রমের কথা বলা যায়। এসব কারণে ভূগর্ভের শিলাস্তরের ওপর চাপের পরিবর্তন হতে পারে অথবা আগে থেকেই থাকা কোনো সক্রিয় ফল্টে চাপের ভারসাম্য বদলে যেতে পারে।
এ ধরনের ভূমিকম্পকে সাধারণভাবে মানবসৃষ্ট বা প্ররোচিত ভূমিকম্প বলা হয়। তবে মানুষের কর্মকাণ্ডের কারণে হওয়া ভূমিকম্পের মাত্রা ও ঝুঁকি স্থানভেদে অনেক ভিন্ন হতে পারে এবং প্রতিটি ভূমিকম্পকে মানুষের কোনো কর্মকাণ্ডের সঙ্গে সরাসরি যুক্ত করা যায় না।
সব মিলিয়ে বলা যায়, ভূমিকম্পের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ কারণ হলো পৃথিবীর টেকটোনিক প্লেটের চলাচল এবং এর ফলে ভূগর্ভের শিলাস্তরে জমে থাকা শক্তির হঠাৎ মুক্তি। আর এই প্রাকৃতিক প্রক্রিয়ার পাশাপাশি আগ্নেয়গিরির কার্যকলাপ ও কিছু মানবিক কর্মকাণ্ডও নির্দিষ্ট পরিস্থিতিতে ভূমিকম্পের কারণ হতে পারে।
ভূমিকম্পের মাত্রা কীভাবে পরিমাপ করা হয়?
ভূমিকম্প কতটা শক্তিশালী ছিল, সেটি বোঝার জন্য বিজ্ঞানীরা বিভিন্ন বৈজ্ঞানিক পদ্ধতি ব্যবহার করেন। ভূমিকম্পের কম্পন খালি হাতে বা সাধারণভাবে দেখে সঠিকভাবে পরিমাপ করা সম্ভব নয়। এ জন্য ব্যবহার করা হয় বিশেষ ধরনের যন্ত্র, যার নাম সিসমোমিটার বা সিসমোগ্রাফ।
সিসমোমিটার মাটির খুব সূক্ষ্ম নড়াচড়াও শনাক্ত করতে পারে। ভূমিকম্প হলে মাটি বিভিন্ন দিকে কাঁপে এবং সেই কম্পন যন্ত্রে রেকর্ড হয়। পৃথিবীর বিভিন্ন জায়গায় থাকা একাধিক সিসমোমিটারের তথ্য একত্র করে বিজ্ঞানীরা ভূমিকম্পের উৎপত্তিস্থল, গভীরতা, কম্পনের ধরন এবং শক্তি সম্পর্কে ধারণা পান।
ভূমিকম্পের শক্তি বোঝাতে বর্তমানে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বৈজ্ঞানিক মাপগুলোর একটি হলো মোমেন্ট ম্যাগনিটিউড স্কেল (Moment Magnitude Scale বা Mw)। এটি ভূমিকম্পের উৎসে মোট কত শক্তি মুক্ত হয়েছে, তা হিসাব করতে সাহায্য করে। বড় ভূমিকম্পের ক্ষেত্রে এই পদ্ধতি বিশেষভাবে কার্যকর।
অনেক মানুষ এখনো ভূমিকম্পের মাত্রা বলতে ‘রিখটার স্কেল’ শব্দটি বেশি শুনে থাকেন। রিখটার স্কেল ঐতিহাসিকভাবে গুরুত্বপূর্ণ হলেও আধুনিক ভূকম্পবিদ্যায় বড় ভূমিকম্পের মাত্রা প্রকাশের জন্য মোমেন্ট ম্যাগনিটিউড বেশি ব্যবহৃত হয়। তাই কোনো ভূমিকম্পকে শুধু ‘রিখটার স্কেলে কত’ বললেই পুরো বৈজ্ঞানিক বিষয়টি বোঝানো হয় না।
এখানে একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো—ভূমিকম্পের মাত্রা এবং ভূমিকম্পের তীব্রতা এক জিনিস নয়। মাত্রা বা Magnitude বোঝায় ভূমিকম্পের উৎস থেকে মোট কত শক্তি মুক্ত হয়েছে। অন্যদিকে তীব্রতা বা Intensity বোঝায় কোনো নির্দিষ্ট জায়গায় সেই ভূমিকম্পের প্রভাব কতটা অনুভূত হয়েছে।
একটি ভূমিকম্পের Magnitude একটি নির্দিষ্ট মান হলেও বিভিন্ন এলাকায় এর Intensity ভিন্ন হতে পারে। যেমন, ভূমিকম্পের কেন্দ্রের কাছাকাছি একটি এলাকায় তীব্র কাঁপুনি অনুভূত হতে পারে, কিন্তু অনেক দূরের এলাকায় একই ভূমিকম্প তুলনামূলক কম অনুভূত হতে পারে।
ভূমিকম্পের ক্ষয়ক্ষতির ক্ষেত্রেও শুধু Magnitude দেখলে পুরো চিত্র পাওয়া যায় না। ভূমিকম্প কত গভীরে হয়েছে, উপকেন্দ্র থেকে কোনো জায়গার দূরত্ব কত, স্থানীয় মাটির ধরন কেমন, ভবনগুলো কতটা শক্ত এবং মানুষ কতটা প্রস্তুত—এসব বিষয়ও ক্ষয়ক্ষতির পরিমাণ নির্ধারণে গুরুত্বপূর্ণ।
আধুনিক ভূকম্পন পর্যবেক্ষণ প্রযুক্তির কারণে এখন বিজ্ঞানীরা আগের তুলনায় অনেক দ্রুত ভূমিকম্প শনাক্ত করতে পারেন। বিভিন্ন অঞ্চলে স্থাপন করা অসংখ্য সেন্সর থেকে পাওয়া তথ্য কম্পিউটার সিস্টেম বিশ্লেষণ করে কয়েক সেকেন্ডের মধ্যেই ভূমিকম্পের অবস্থান ও আনুমানিক মাত্রা নির্ণয়ের চেষ্টা করা হয়।
কিছু দেশে Earthquake Early Warning বা ভূমিকম্পের আগাম সতর্কবার্তা ব্যবস্থা ব্যবহার করা হচ্ছে। এটি ভূমিকম্প শুরু হওয়ার আগে ভবিষ্যদ্বাণী করে না। বরং ভূমিকম্প শুরু হওয়ার পর দ্রুতগতির কম্পন শনাক্ত করে এবং অপেক্ষাকৃত ধীর ও বেশি ক্ষতিকর কম্পন কোনো এলাকায় পৌঁছানোর আগে সেখানে সতর্কবার্তা পাঠানোর চেষ্টা করে। ফলে কিছু ক্ষেত্রে মানুষ কয়েক সেকেন্ডের মূল্যবান সময় পেতে পারে।
এই কয়েক সেকেন্ডও অনেক গুরুত্বপূর্ণ হতে পারে। কেউ দ্রুত মাথা ও শরীর নিরাপদ করতে পারে, গ্যাস বা যন্ত্রপাতি বন্ধ করার সুযোগ পেতে পারে, ট্রেন বা শিল্পকারখানার স্বয়ংক্রিয় ব্যবস্থা নিরাপদ অবস্থায় যেতে পারে এবং জরুরি পরিষেবাগুলো প্রস্তুতি নিতে পারে।
তবে প্রযুক্তি যত উন্নতই হোক, এখনো এমন কোনো নির্ভরযোগ্য প্রযুক্তি নেই যা ভূমিকম্পের ঠিক সময়, স্থান ও মাত্রা আগে থেকেই নিশ্চিতভাবে বলে দিতে পারে। তাই ভূমিকম্পের ক্ষেত্রে বৈজ্ঞানিক পর্যবেক্ষণের পাশাপাশি ব্যক্তিগত প্রস্তুতি ও নিরাপত্তা সচেতনতাই সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ।
ভূমিকম্পের প্রভাব
ভূমিকম্পের প্রভাব শুধু মাটি কাঁপার মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকে না। একটি শক্তিশালী ভূমিকম্প কয়েক সেকেন্ডের মধ্যে মানুষের স্বাভাবিক জীবনযাত্রাকে এলোমেলো করে দিতে পারে। কোথাও ভবন ধসে পড়ে, কোথাও রাস্তা ও সেতু ক্ষতিগ্রস্ত হয়, আবার কোথাও বিদ্যুৎ, পানি, গ্যাস ও যোগাযোগব্যবস্থা বন্ধ হয়ে যেতে পারে। ভূমিকম্পের ক্ষয়ক্ষতি কতটা হবে, তা নির্ভর করে ভূমিকম্পের শক্তি, গভীরতা, উপকেন্দ্রের দূরত্ব, মাটির ধরন, ভবনের নির্মাণমান এবং মানুষের প্রস্তুতির ওপর।
ঘরবাড়ি ও স্থাপনার ক্ষতি
শক্তিশালী ভূমিকম্পের সবচেয়ে দৃশ্যমান প্রভাবগুলোর একটি হলো ভবন ও স্থাপনার ক্ষতি। মাটি হঠাৎ তীব্রভাবে কাঁপলে দুর্বল বা অপরিকল্পিতভাবে নির্মিত ভবনের দেয়াল ফেটে যেতে পারে, ছাদ বা বারান্দা ভেঙে পড়তে পারে, এমনকি পুরো ভবন ধসে যেতে পারে।
শুধু বাড়িঘর নয়, স্কুল, হাসপাতাল, অফিস, মার্কেট, কারখানা এবং অন্যান্য গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনাও ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে। একটি ভবন পুরোপুরি ধসে না পড়লেও ভেতরের বৈদ্যুতিক ব্যবস্থা, পানির পাইপ, গ্যাসের লাইন, লিফট ও অন্যান্য অবকাঠামো ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে।
ভূমিকম্পের সময় আসবাবপত্র, কাচ, তাকের ওপর রাখা ভারী জিনিস বা ঝুলন্ত বস্তু পড়ে গিয়েও মানুষের আহত হওয়ার আশঙ্কা থাকে। অনেক সময় ভবন ধসের চেয়েও এসব পড়ে যাওয়া জিনিস তাৎক্ষণিকভাবে বেশি বিপদ তৈরি করতে পারে।
রাস্তা ও সেতুও ভূমিকম্পের কারণে ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে। কোথাও রাস্তার ওপর ফাটল তৈরি হতে পারে, কোথাও সেতুর কাঠামো দুর্বল হয়ে যেতে পারে। এতে জরুরি উদ্ধারকাজ বাধাগ্রস্ত হতে পারে এবং দুর্গত এলাকায় দ্রুত পৌঁছানো কঠিন হয়ে পড়ে।
ভূমিধস ও সুনামি
ভূমিকম্পের কারণে শুধু ভবন নয়, প্রকৃতির ওপরও বড় ধরনের প্রভাব পড়তে পারে। পাহাড়ি এলাকায় শক্তিশালী ভূমিকম্প হলে মাটি ও পাথরের স্থিতিশীলতা নষ্ট হয়ে ভূমিধস ঘটতে পারে। পাহাড়ের ঢাল থেকে মাটি, পাথর ও ধ্বংসাবশেষ নিচে নেমে এসে রাস্তা, ঘরবাড়ি বা বসতিতে আঘাত করতে পারে।
ভূমিকম্প যদি সমুদ্রের তলদেশে ঘটে এবং সমুদ্রের তলদেশের একটি বড় অংশ হঠাৎ ওপরে বা নিচে সরে যায়, তাহলে সমুদ্রের পানিতে ব্যাপক স্থানচ্যুতি ঘটতে পারে। এর ফলে সৃষ্টি হতে পারে সুনামি।
সুনামি সাধারণ ঢেউয়ের মতো নয়। এটি সমুদ্রের গভীরে দীর্ঘ তরঙ্গ হিসেবে ছড়িয়ে যেতে পারে এবং উপকূলের অগভীর পানিতে পৌঁছানোর পর এর উচ্চতা অনেক বেড়ে যেতে পারে। তখন বিশাল পরিমাণ পানি উপকূলীয় এলাকায় ঢুকে পড়ে ব্যাপক ক্ষতি করতে পারে।
তবে সমুদ্রের নিচে হওয়া প্রতিটি ভূমিকম্প থেকে সুনামি সৃষ্টি হয় না। ভূমিকম্পের গভীরতা, মাত্রা, সমুদ্রতলের উল্লম্ব নড়াচড়া এবং ভূমিকম্পের অবস্থানের মতো বিভিন্ন বিষয়ের ওপর সুনামির বা ঘূর্ণিঝড় এর ঝুঁকি নির্ভর করে।
ভূমিকম্পের পর আরও কিছু গৌণ বিপদ দেখা দিতে পারে। যেমন কোথাও মাটি তরলের মতো আচরণ করতে শুরু করতে পারে, যাকে মাটির তরলীকরণ বা Liquefaction বলা হয়। বিশেষ করে পানিতে সম্পৃক্ত আলগা মাটিতে এ ধরনের ঘটনা ঘটলে ভবন ও অন্যান্য স্থাপনার ভিত্তি দুর্বল হয়ে যেতে পারে।
মানুষের জীবন ও পরিবেশের ওপর প্রভাব
ভূমিকম্পের সবচেয়ে বড় ক্ষতি হয় মানুষের জীবনে। শক্তিশালী ভূমিকম্পে মানুষ আহত বা নিহত হতে পারে। ভবন ধসে পড়লে ধ্বংসস্তূপের নিচে মানুষ আটকে যেতে পারে এবং দ্রুত উদ্ধার না হলে পরিস্থিতি আরও ভয়াবহ হয়ে উঠতে পারে।
ভূমিকম্পের পর অনেক পরিবার সাময়িকভাবে ঘরবাড়ি হারিয়ে আশ্রয়কেন্দ্র বা অন্য নিরাপদ স্থানে যেতে বাধ্য হতে পারে। পানি, খাবার, ওষুধ, বিদ্যুৎ ও নিরাপদ আশ্রয়ের সংকট তৈরি হতে পারে। হাসপাতালগুলোতে হঠাৎ রোগী ও আহত মানুষের সংখ্যা বেড়ে গেলে চিকিৎসাব্যবস্থার ওপরও অতিরিক্ত চাপ পড়ে।
যোগাযোগব্যবস্থা ভেঙে পড়লে পরিস্থিতি আরও কঠিন হয়ে যায়। মোবাইল নেটওয়ার্ক, ইন্টারনেট, বিদ্যুৎ বা রাস্তা ক্ষতিগ্রস্ত হলে জরুরি সহায়তা চাওয়া এবং উদ্ধারকারী দলের সঙ্গে যোগাযোগ করা কঠিন হতে পারে।
ভূমিকম্প মানুষের মানসিক স্বাস্থ্যের ওপরও গভীর প্রভাব ফেলতে পারে। হঠাৎ মাটি কেঁপে ওঠা, প্রিয়জনকে হারানো, বাড়িঘর ধ্বংস হওয়া বা ভবিষ্যৎ নিয়ে অনিশ্চয়তা মানুষের মধ্যে দীর্ঘস্থায়ী ভয় ও উদ্বেগ তৈরি করতে পারে। বিশেষ করে শিশু ও বয়স্কদের ওপর এর প্রভাব অনেক সময় আরও বেশি দেখা যায়।
পরিবেশের ওপরও ভূমিকম্পের প্রভাব থাকতে পারে। ভূমিধস, নদীর গতিপথের পরিবর্তন, মাটির ফাটল, পাহাড়ের অংশবিশেষ ধসে পড়া কিংবা উপকূলীয় এলাকায় পানির প্রবাহের পরিবর্তনের মতো ঘটনা ঘটতে পারে।
তবে ভূমিকম্পের ক্ষয়ক্ষতি সবসময় শুধু প্রকৃতির শক্তির ওপর নির্ভর করে না। একটি একই মাত্রার ভূমিকম্প দুই জায়গায় ঘটলেও ক্ষয়ক্ষতি এক রকম নাও হতে পারে। যেখানে ভবন শক্তিশালী, নির্মাণবিধি মানা হয় এবং মানুষ আগে থেকেই প্রস্তুত থাকে, সেখানে প্রাণহানি ও সম্পদের ক্ষতি তুলনামূলকভাবে কমানো সম্ভব।
এ কারণেই ভূমিকম্পকে পুরোপুরি ঠেকানো সম্ভব না হলেও এর ক্ষয়ক্ষতি অনেকটাই কমানো সম্ভব। নিরাপদ ভবন নির্মাণ, নিয়মিত মহড়া, জরুরি প্রস্তুতি, দ্রুত সতর্কবার্তা ব্যবস্থা এবং সঠিক সময়ে সঠিক সিদ্ধান্ত—সবকিছু মিলেই ভূমিকম্পের ঝুঁকি কমানোর সবচেয়ে কার্যকর উপায় তৈরি করে।
ভূমিকম্পের আগে কী কী প্রস্তুতি নেওয়া উচিত?
ভূমিকম্প কখন হবে, তা নির্দিষ্ট করে আগে থেকে বলা এখনো সম্ভব নয়। তাই ভূমিকম্পের প্রস্তুতি নেওয়ার সবচেয়ে ভালো সময় হলো ভূমিকম্প হওয়ার আগেই। কয়েকটি ছোট প্রস্তুতি বিপদের মুহূর্তে বড় পার্থক্য তৈরি করতে পারে। বিশেষ করে পরিবারের সবাই যদি আগে থেকেই জানে কে কী করবে, তাহলে আতঙ্কের মধ্যে ভুল সিদ্ধান্ত নেওয়ার আশঙ্কা কমে যায়।
ঘরের নিরাপদ জায়গাগুলো আগে থেকেই চিহ্নিত করুন
বাড়ির কোন জায়গাগুলো তুলনামূলক নিরাপদ, তা পরিবারের সবাইকে নিয়ে আগে থেকেই ঠিক করে রাখুন। শক্ত টেবিল বা মজবুত আসবাবের নিচে আশ্রয় নেওয়ার সুযোগ আছে কি না দেখে রাখুন।
জানালা, কাচের দরজা, আয়না, ঝুলন্ত ভারী বস্তু, আলমারি এবং এমন কোনো জায়গার পাশে অবস্থান না নেওয়াই ভালো, যেখান থেকে কিছু পড়ে গিয়ে আঘাত করতে পারে।
ভারী আসবাবপত্র নিরাপদ করুন
আলমারি, বুকশেলফ, টিভি, ওয়াটার হিটার বা দেয়ালে ঝোলানো ভারী জিনিস ভালোভাবে স্থির করে রাখা উচিত। ভূমিকম্পের সময় এসব জিনিস পড়ে গিয়ে গুরুতর আঘাতের কারণ হতে পারে।
বিশেষ করে শিশুদের ঘর ও ঘুমানোর জায়গার আশপাশে ভারী আসবাবপত্র বা ঝুলন্ত বস্তু আছে কি না পরীক্ষা করে দেখুন।
জরুরি ব্যাগ প্রস্তুত রাখুন
ভূমিকম্পের পর বিদ্যুৎ, পানি, যোগাযোগ বা দোকানপাটের স্বাভাবিক কার্যক্রম সাময়িকভাবে বন্ধ হয়ে যেতে পারে। তাই একটি জরুরি ব্যাগ প্রস্তুত রাখা ভালো।
ব্যাগে প্রয়োজনীয় পানি, শুকনো খাবার, টর্চ, অতিরিক্ত ব্যাটারি, প্রাথমিক চিকিৎসার সামগ্রী, প্রয়োজনীয় ওষুধ, বাঁশি, পাওয়ার ব্যাংক, প্রয়োজনীয় কাগজপত্রের কপি এবং কিছু জরুরি অর্থ রাখা যেতে পারে।
পরিবারে শিশু, বয়স্ক ব্যক্তি বা বিশেষ প্রয়োজন আছে এমন কেউ থাকলে তার প্রয়োজনীয় জিনিসও আলাদা করে প্রস্তুত রাখা উচিত।
গ্যাস, বিদ্যুৎ ও পানির সংযোগ সম্পর্কে জানুন
বাড়ির প্রধান বিদ্যুৎ সুইচ, গ্যাসের লাইন বা গ্যাসের চুলার নিয়ন্ত্রণ এবং পানির প্রধান সংযোগ কোথায়—পরিবারের একাধিক সদস্যের তা জানা থাকা ভালো।
ভূমিকম্পের পর কোথাও গ্যাসের লাইন ক্ষতিগ্রস্ত হলে আগুন বা বিস্ফোরণের ঝুঁকি তৈরি হতে পারে। তাই প্রয়োজন হলে কীভাবে নিরাপদভাবে সংযোগ বন্ধ করতে হবে, তা আগে থেকেই জেনে রাখা উচিত।
পরিবারের জরুরি যোগাযোগ পরিকল্পনা তৈরি করুন
ভূমিকম্পের সময় পরিবারের সদস্যরা এক জায়গায় না-ও থাকতে পারেন। কেউ স্কুলে, কেউ অফিসে, কেউ বাইরে থাকলে যোগাযোগ করা কঠিন হয়ে যেতে পারে।
তাই আগে থেকেই একটি জরুরি যোগাযোগ পরিকল্পনা তৈরি করুন। পরিবারের সবাই কোথায় মিলিত হবে, কার সঙ্গে যোগাযোগ করা হবে এবং কাছাকাছি কোন নিরাপদ জায়গায় আশ্রয় নেওয়া যাবে—এসব ঠিক করে রাখা ভালো।
শিশুদেরও তাদের বাবা-মা বা অভিভাবকের সঙ্গে যোগাযোগের প্রয়োজনীয় তথ্য শেখানো উচিত।
ভবনের নিরাপত্তা পরীক্ষা করুন
ভূমিকম্পপ্রবণ এলাকায় ভবন কতটা নিরাপদ, সেটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। পুরোনো বা দুর্বল ভবনে বড় ধরনের পরিবর্তন, অতিরিক্ত তলা নির্মাণ কিংবা দেয়াল ভাঙার মতো কাজ করার আগে অবশ্যই বিশেষজ্ঞের পরামর্শ নেওয়া উচিত।
নতুন ভবন নির্মাণের ক্ষেত্রে স্থানীয় নির্মাণবিধি ও ভূমিকম্প-সহনশীল নকশা অনুসরণ করা জরুরি। শুধু দেখতে সুন্দর হলেই একটি ভবন নিরাপদ হয় না; এর কাঠামোগত শক্তি এবং সঠিক প্রকৌশল নকশাই বিপদের সময় জীবন রক্ষা করতে পারে।
স্কুল ও কর্মস্থলে মহড়ার ব্যবস্থা করুন
শুধু বই পড়ে ভূমিকম্পের নিরাপত্তা শেখা যথেষ্ট নয়। নিয়মিত ভূমিকম্প মহড়া করলে মানুষ বাস্তবে কী করতে হবে, তা দ্রুত মনে করতে পারে।
স্কুল, অফিস, কারখানা ও অন্যান্য প্রতিষ্ঠানে কোথায় বের হওয়ার পথ, কোথায় জরুরি সরঞ্জাম এবং কোথায় নিরাপদে জড়ো হতে হবে—এসব আগে থেকেই জানা থাকা উচিত।
জরুরি নম্বর ও প্রয়োজনীয় তথ্য সংরক্ষণ করুন
পরিবারের সদস্যদের ফোন নম্বরের পাশাপাশি স্থানীয় জরুরি সেবা, হাসপাতাল, ফায়ার সার্ভিস বা অন্যান্য প্রয়োজনীয় প্রতিষ্ঠানের যোগাযোগের তথ্য সংরক্ষণ করে রাখা যেতে পারে।
শুধু মোবাইল ফোনে নম্বর রাখার ওপর নির্ভর না করে প্রয়োজনীয় নম্বরগুলো লিখে নিরাপদ জায়গায় রাখাও ভালো। কারণ দুর্যোগের সময় ফোনের ব্যাটারি শেষ হয়ে যেতে পারে বা নেটওয়ার্কে সমস্যা হতে পারে।
ভূমিকম্পের সতর্কবার্তা প্রযুক্তি সম্পর্কে জানুন
আধুনিক সময়ে কিছু দেশে Earthquake Early Warning বা ভূমিকম্পের আগাম সতর্কবার্তা ব্যবস্থা চালু রয়েছে। এসব ব্যবস্থা ভূমিকম্প হওয়ার অনেক আগে ভবিষ্যদ্বাণী করে না। বরং ভূমিকম্প শুরু হওয়ার পর সেন্সরের মাধ্যমে দ্রুত কম্পন শনাক্ত করে ক্ষতিকর কম্পন পৌঁছানোর আগে কিছু এলাকায় সতর্কবার্তা দেওয়ার চেষ্টা করে।
যেখানে এ ধরনের সরকারি বা নির্ভরযোগ্য সতর্কবার্তা ব্যবস্থা চালু আছে, সেখানে সেটি কীভাবে কাজ করে এবং সতর্কবার্তা পেলে কী করতে হবে, তা জানা গুরুত্বপূর্ণ।
সবশেষে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো—প্রস্তুতি শুধু জিনিসপত্র জমিয়ে রাখার নাম নয়। পরিবারের সবাইকে নিয়ে আগে থেকেই পরিকল্পনা করা, নিরাপদ জায়গা চিহ্নিত করা এবং নিয়মিত মহড়া দেওয়া—এই অভ্যাসগুলোই ভূমিকম্পের মুহূর্তে আতঙ্ক কমিয়ে দ্রুত সঠিক সিদ্ধান্ত নিতে সাহায্য করতে পারে। দেখুন-
সর্বশেষ ভূমিকম্প – বাংলাদেশ আবহাওয়া অধিদপ্তর (বিএমডি)
ভূমিকম্পের সময় কী করণীয়?
ভূমিকম্প শুরু হলে সবচেয়ে বড় ভুল হলো আতঙ্কিত হয়ে দৌড়াদৌড়ি করা। কয়েক সেকেন্ডের মধ্যে আমরা ভয় পেয়ে এমন সিদ্ধান্ত নিতে পারি, যা উল্টো আরও বিপদ ডেকে আনতে পারে। তাই ভূমিকম্পের সময় মূল লক্ষ্য হবে মাথা ও শরীরকে আঘাত থেকে রক্ষা করা এবং কম্পন থামা পর্যন্ত নিরাপদ অবস্থানে থাকা।
ভূমিকম্পের সময় সবচেয়ে পরিচিত নিরাপত্তা পদ্ধতি হলো Drop, Cover and Hold On—অর্থাৎ নিচু হন, আড়াল নিন এবং শক্ত করে ধরে থাকুন। মাটিতে নিচু হয়ে পড়ুন, শক্ত টেবিল বা ডেস্কের নিচে আশ্রয় নিন এবং সেটি ধরে থাকুন। মাথা ও ঘাড় দুই হাত দিয়ে ঢেকে রাখুন।
ঘরের ভেতরে থাকলে
ভূমিকম্প শুরু হলে ঘরের ভেতরেই থাকুন। বাইরে বের হওয়ার জন্য হঠাৎ দরজার দিকে দৌড় দেবেন না। কারণ কম্পনের সময় দেয়াল, কাচ, ছাদের অংশ, বৈদ্যুতিক তার বা অন্যান্য বস্তু পড়ে গিয়ে আঘাত করতে পারে।
কাছাকাছি শক্ত টেবিল বা ডেস্ক থাকলে তার নিচে ঢুকে পড়ুন এবং টেবিলের পা শক্ত করে ধরে রাখুন। মাথা ও ঘাড় দুই হাত দিয়ে ঢেকে রাখুন। টেবিল না থাকলে ঘরের ভেতরের তুলনামূলক নিরাপদ স্থানে নিচু হয়ে মাথা ও ঘাড় ঢেকে থাকুন।
জানালা, কাচের দরজা, আয়না, ঝুলন্ত ভারী বস্তু, আলমারি ও বুকশেলফ থেকে দূরে থাকুন। এগুলো ভেঙে বা পড়ে গিয়ে গুরুতর আঘাত করতে পারে।
ভূমিকম্পের সময় লিফট ব্যবহার করবেন না। বিদ্যুৎ চলে গেলে বা ভবনের কোনো অংশ ক্ষতিগ্রস্ত হলে লিফটে আটকে পড়ার ঝুঁকি থাকে।
দরজার চৌকাঠে দাঁড়ানোও সাধারণভাবে নিরাপদ কোনো বিশেষ পদ্ধতি নয়। পুরোনো কাঠের বাড়ির প্রচলিত ছবির মতো দরজার ফ্রেমে দাঁড়িয়ে থাকা আধুনিক ভবনে ভূমিকম্পের সময় আলাদা কোনো সুরক্ষা নিশ্চিত করে না।
যদি বিছানায় থাকেন এবং আশপাশে ভারী কোনো বস্তু পড়ে যাওয়ার ঝুঁকি না থাকে, তাহলে সেখানেই থেকে বালিশ দিয়ে মাথা ও ঘাড় ঢেকে রাখুন। শুধু বাইরে যাওয়ার জন্য বিছানা থেকে উঠে দৌড়ানোর প্রয়োজন নেই।
বাইরে থাকলে
ভূমিকম্পের সময় আপনি যদি বাইরে থাকেন, তাহলে ভবন থেকে দূরে সরে গিয়ে খোলা জায়গায় থাকার চেষ্টা করুন। ভবনের দেয়াল, কাচের জানালা, বৈদ্যুতিক খুঁটি, গাছ, সাইনবোর্ড বা অন্য কোনো পড়ে যেতে পারে এমন বস্তুর কাছাকাছি যাবেন না।
খোলা জায়গায় থাকলে নিচু হয়ে থাকুন এবং কম্পন থামা পর্যন্ত নিজের মাথা ও ঘাড় রক্ষা করুন।
ভূমিকম্পের সময় কোনো ভবনের প্রবেশপথের নিচে দাঁড়িয়ে থাকা নিরাপদ ধরে নেওয়া ঠিক নয়। ভবন থেকে কিছু ভেঙে পড়ে সেখানে আঘাত করতে পারে।
কম্পন থেমে গেলেও সতর্ক থাকুন। আফটারশক বা পরবর্তী কম্পন হতে পারে। প্রথম কম্পনের পর দুর্বল হয়ে যাওয়া কোনো ভবনের কাছে যাওয়া বিপজ্জনক হতে পারে।
গাড়িতে থাকলে
ভূমিকম্প শুরু হওয়ার সময় গাড়িতে থাকলে আতঙ্কিত হয়ে দ্রুত গাড়ি চালিয়ে যাওয়ার চেষ্টা করবেন না। নিরাপদভাবে সম্ভব হলে রাস্তার পাশে গাড়ি থামিয়ে রাখুন এবং গাড়ির ভেতরেই থাকুন।
সেতু, উড়ালসড়ক, বৈদ্যুতিক খুঁটি, গাছ, ভবন বা এমন কোনো স্থাপনার নিচে গাড়ি থামাবেন না, যেগুলো ক্ষতিগ্রস্ত হয়ে গাড়ির ওপর পড়ে যেতে পারে।
গাড়ি থামানোর পর সিটবেল্ট বাঁধা অবস্থায় থাকুন এবং কম্পন থামা পর্যন্ত অপেক্ষা করুন। রাস্তা ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে কি না বা কোথাও বৈদ্যুতিক তার পড়ে আছে কি না, তা না দেখে গাড়ি চালিয়ে সামনে এগিয়ে যাওয়া বিপজ্জনক হতে পারে।
ভূমিকম্পের সময় আপনি যে জায়গাতেই থাকুন না কেন, মূল নীতিটি একই—দৌড়ে বের হওয়ার চেষ্টা না করে প্রথমে নিজেকে আঘাত থেকে রক্ষা করুন।
ভূমিকম্পের কয়েক সেকেন্ডে সবকিছু নিয়ন্ত্রণ করা সম্ভব নয়। কিন্তু আগে থেকে জানা থাকলে আতঙ্কের মধ্যেও সঠিক কাজ করার সম্ভাবনা অনেক বেড়ে যায়। কম্পন থামার পর পরিস্থিতি বুঝে নিরাপদে বের হওয়া এবং আশপাশের ঝুঁকি যাচাই করাই হবে পরবর্তী পদক্ষেপ।
ভূমিকম্পের পর কী করণীয়?
ভূমিকম্পের মূল কম্পন থেমে গেলেই বিপদ শেষ হয়ে যায় না। বরং অনেক সময় এর পরেও আফটারশক বা পরবর্তী কম্পন হতে পারে। প্রথম কম্পনে দুর্বল হয়ে যাওয়া ভবন, দেয়াল বা অন্য কোনো স্থাপনা পরবর্তী কম্পনে ধসে পড়তে পারে। তাই কম্পন থামার পরও শান্ত থেকে একে একে নিরাপত্তার বিষয়গুলো নিশ্চিত করা জরুরি।
প্রথমে নিজের শরীরে কোনো আঘাত লেগেছে কি না দেখুন। এরপর আশপাশের পরিবারের সদস্য, শিশু, বয়স্ক ব্যক্তি বা আহত কেউ সাহায্যের প্রয়োজন করছে কি না খেয়াল করুন। তবে নিজের নিরাপত্তা ঝুঁকিতে ফেলে অন্য কাউকে উদ্ধার করতে যাবেন না।
ভবনের ভেতরে থাকলে চারপাশ ভালোভাবে না দেখে হঠাৎ বের হওয়ার চেষ্টা করবেন না। কোথাও কাচ ভেঙে পড়ে থাকতে পারে, দেয়ালে ফাটল তৈরি হতে পারে কিংবা বৈদ্যুতিক তার ছিঁড়ে পড়ে থাকতে পারে। পরিস্থিতি নিরাপদ মনে হলে সিঁড়ি ব্যবহার করে বের হন। লিফট ব্যবহার করা উচিত নয়।
গ্যাসের গন্ধ পেলে আগুন জ্বালাবেন না এবং কোনো বৈদ্যুতিক সুইচ অন বা অফ করার চেষ্টা করবেন না। নিরাপদভাবে সম্ভব হলে গ্যাসের প্রধান সংযোগ বন্ধ করে ভবন থেকে দূরে সরে যান এবং সংশ্লিষ্ট জরুরি সেবাকে খবর দিন।
বিদ্যুতের ছেঁড়া তার দেখলে তার কাছাকাছি যাবেন না। পানির পাইপ ভেঙে গেলে বা রাস্তা ক্ষতিগ্রস্ত হলে সেই জায়গা এড়িয়ে চলুন। ভূমিকম্পের পর শুধু চোখে দেখা ক্ষতির ওপর নির্ভর না করে সম্ভাব্য গৌণ বিপদগুলোর কথাও মাথায় রাখতে হবে।
ভবনের দেয়াল বা কাঠামোতে বড় ফাটল দেখা গেলে কিংবা ভবনটি হেলে পড়লে ভেতরে ফিরে যাবেন না। বিশেষজ্ঞরা ভবনটি নিরাপদ ঘোষণা না করা পর্যন্ত দূরে থাকাই ভালো।
ভূমিকম্পের পর সমুদ্র বা উপকূলের কাছাকাছি এলাকায় থাকলে পরিস্থিতি আরও গুরুত্ব দিয়ে পর্যবেক্ষণ করতে হবে। শক্তিশালী ভূমিকম্পের পর সুনামির সতর্কবার্তা জারি হলে দ্রুত উপকূল থেকে দূরে সরে উঁচু বা নির্ধারিত নিরাপদ এলাকায় যেতে হবে। শুধু সমুদ্রের পানি অস্বাভাবিকভাবে সরে যাওয়ার অপেক্ষা করা উচিত নয়; সরকারি সতর্কবার্তা থাকলে সেটিই অনুসরণ করতে হবে।
আফটারশক সম্পর্কে সতর্ক থাকুন। ভূমিকম্পের পর ছোট বা বড় আরও কম্পন হতে পারে। কোনো আফটারশক অনুভূত হলে আবারও নিচু হয়ে মাথা ও ঘাড় ঢেকে নিরাপদ আশ্রয় নিতে হবে।
জরুরি পরিস্থিতিতে ফোনের ব্যবহারও গুরুত্বপূর্ণ। সবাই একসঙ্গে ফোন করলে নেটওয়ার্কে চাপ তৈরি হতে পারে। তাই সম্ভব হলে দীর্ঘ ফোনালাপ না করে জরুরি যোগাযোগের জন্য ফোন ব্যবহার করুন। প্রয়োজনীয় তথ্য বা সরকারি নির্দেশনা জানতে নির্ভরযোগ্য সরকারি ও জরুরি সেবা সংস্থার ঘোষণা অনুসরণ করুন।
পানি ও খাবারের ক্ষেত্রেও সতর্কতা প্রয়োজন। পানির উৎস দূষিত হওয়ার আশঙ্কা থাকলে নিশ্চিত না হয়ে সেই পানি পান করা উচিত নয়। জরুরি অবস্থায় নিরাপদ পানির ব্যবস্থা করা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
ধ্বংসস্তূপের নিচে কেউ আটকে আছে বলে মনে হলে নিজের মতো করে ভারী কাঠামো সরানোর চেষ্টা না করে উদ্ধারকারী দলকে খবর দিন। তবে আটকে থাকা ব্যক্তি যদি কাছে থাকে এবং কথা বলতে পারেন, তাকে শান্ত থাকার পরামর্শ দিন। চিৎকার করে অতিরিক্ত শক্তি নষ্ট না করে সম্ভব হলে দেয়াল বা পাইপে ধাতব বস্তু দিয়ে শব্দ করা বা বাঁশি ব্যবহার করে নিজের অবস্থান জানানোর চেষ্টা করা যেতে পারে।
ভূমিকম্পের পর সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে অনেক ধরনের গুজব ছড়িয়ে পড়তে পারে। কোনো যাচাই না করা খবর, ভূমিকম্পের পর আবার ঠিক কখন বড় ভূমিকম্প হবে—এমন দাবি বা ভুয়া সতর্কবার্তা বিশ্বাস করে আতঙ্কিত হওয়া উচিত নয়। ভূমিকম্পের সঠিক সময় আগে থেকে নিশ্চিতভাবে বলে দেওয়ার মতো নির্ভরযোগ্য প্রযুক্তি এখনো নেই।
সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হলো, ভূমিকম্পের পর তাড়াহুড়ো না করে পরিস্থিতি বুঝে কাজ করা। নিজের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা, আহতদের সহায়তা করা, ক্ষতিগ্রস্ত ভবন এড়িয়ে চলা, আফটারশকের জন্য প্রস্তুত থাকা এবং সরকারি নির্দেশনা অনুসরণ করা—এই কয়েকটি বিষয় দুর্যোগের পর জীবন রক্ষায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে।
১০. ভূমিকম্প থেকে নিরাপদ থাকার গুরুত্বপূর্ণ সতর্কতা
ভূমিকম্পকে থামিয়ে দেওয়া মানুষের পক্ষে সম্ভব নয়। কখন ভূমিকম্প হবে, সেটিও নির্ভুলভাবে আগে থেকে জানা যায় না। তবে কিছু অভ্যাস ও সতর্কতা মেনে চললে ভূমিকম্পের সময় আহত হওয়ার ঝুঁকি এবং সম্পদের ক্ষয়ক্ষতি অনেকটাই কমানো সম্ভব।
সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, ভূমিকম্পের সময় আতঙ্কিত হয়ে দৌড়াদৌড়ি না করা। হঠাৎ দৌড়ে সিঁড়ি দিয়ে নামতে গিয়ে পড়ে যাওয়া, কাচে পা কেটে যাওয়া কিংবা ভবনের কোনো অংশের নিচে আটকে যাওয়ার ঝুঁকি তৈরি হতে পারে। তাই কম্পন শুরু হলে যেখানে আছেন, সেখানেই প্রথমে নিজেকে নিরাপদ করার চেষ্টা করুন।
ঘরের ভেতরে থাকলে শক্ত টেবিল বা ডেস্কের নিচে আশ্রয় নেওয়া, মাথা ও ঘাড় ঢেকে রাখা এবং টেবিলটি ধরে রাখা নিরাপদ থাকার অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ পদ্ধতি। জানালা, কাচ, আলমারি, ঝুলন্ত ভারী বস্তু ও অন্যান্য পড়ে যেতে পারে এমন জিনিস থেকে দূরে থাকুন।
ভূমিকম্পের সময় লিফট ব্যবহার করবেন না। বিদ্যুৎ চলে গেলে লিফটের ভেতরে আটকে পড়ার পাশাপাশি ভবনের কাঠামোগত ক্ষতির কারণে আরও ঝুঁকি তৈরি হতে পারে।
বাড়িতে ভারী আসবাবপত্র, বুকশেলফ, টিভি বা দেয়ালে ঝোলানো ভারী জিনিস থাকলে সেগুলো আগে থেকেই ভালোভাবে স্থির করে রাখুন। ভূমিকম্পের সময় এসব জিনিস পড়ে গিয়ে বড় ধরনের আঘাতের কারণ হতে পারে।
গ্যাসের চুলা, বৈদ্যুতিক সংযোগ ও অন্যান্য ঝুঁকিপূর্ণ যন্ত্রপাতি সম্পর্কে পরিবারের সদস্যদের সচেতন করুন। ভূমিকম্পের পর গ্যাস লিক বা বৈদ্যুতিক তার ক্ষতিগ্রস্ত হলে আগুন লাগার আশঙ্কা থাকতে পারে। গ্যাসের গন্ধ পেলে ম্যাচ, লাইটার বা বৈদ্যুতিক সুইচ ব্যবহার না করে নিরাপদ দূরত্বে সরে যান।
ভূমিকম্পের সময় বাইরে থাকলে ভবন, কাচের জানালা, বৈদ্যুতিক খুঁটি, সাইনবোর্ড ও গাছ থেকে দূরে থাকুন। খোলা জায়গায় থাকলে নিচু হয়ে মাথা ও ঘাড় রক্ষা করুন।
গাড়িতে থাকলে নিরাপদভাবে গাড়ি থামিয়ে ভেতরে থাকুন। সেতু, উড়ালসড়ক, গাছ, বৈদ্যুতিক খুঁটি বা ভবনের নিচে গাড়ি থামাবেন না।
ভূমিকম্পের পর ক্ষতিগ্রস্ত ভবনে অযথা প্রবেশ করবেন না। বাইরে থেকে ভবনটি ঠিক মনে হলেও ভেতরের কাঠামো দুর্বল হয়ে থাকতে পারে। বিশেষজ্ঞদের পরীক্ষা ও নিরাপত্তা নিশ্চিত না হওয়া পর্যন্ত এমন ভবন এড়িয়ে চলাই নিরাপদ।
ভূমিকম্পের পর আফটারশকের জন্য প্রস্তুত থাকুন। প্রথম কম্পন থেমে যাওয়ার পরও আবার কাঁপুনি হতে পারে। তাই প্রথম ভূমিকম্পের পরপরই সবকিছু স্বাভাবিক হয়ে গেছে ধরে নেওয়া ঠিক নয়।
জরুরি পরিস্থিতির জন্য একটি ছোট ব্যাগ প্রস্তুত রাখাও গুরুত্বপূর্ণ। এতে পানি, শুকনো খাবার, টর্চ, অতিরিক্ত ব্যাটারি, পাওয়ার ব্যাংক, প্রাথমিক চিকিৎসার সামগ্রী, প্রয়োজনীয় ওষুধ এবং বাঁশি রাখা যেতে পারে।
পরিবারের সবাইকে নিয়ে নিয়মিত ভূমিকম্প মহড়া করা ভালো। বিশেষ করে শিশুদের শেখাতে হবে যে ভূমিকম্প শুরু হলে আতঙ্কিত হয়ে দরজার দিকে দৌড়ানো নয়, বরং নিচু হয়ে নিরাপদ আশ্রয় নিতে হবে।
আধুনিক প্রযুক্তির সতর্কবার্তা ব্যবস্থার ওপরও নজর রাখা যেতে পারে। কিছু দেশে Earthquake Early Warning ব্যবস্থা ভূমিকম্প শুরু হওয়ার পর দ্রুত কম্পন শনাক্ত করে ক্ষতিকর তরঙ্গ পৌঁছানোর আগে কিছু এলাকায় সতর্কবার্তা দেওয়ার চেষ্টা করে। তবে এটিকে ভূমিকম্পের পূর্বাভাস হিসেবে মনে করা যাবে না।
আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ সতর্কতা হলো গুজব থেকে দূরে থাকা। ভূমিকম্পের পর সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ‘আর কিছুক্ষণ পর বড় ভূমিকম্প হবে’ বা ‘অমুক সময়ে ভূমিকম্প হবে’—এ ধরনের নানা দাবি ছড়িয়ে পড়তে পারে। নির্ভরযোগ্য বৈজ্ঞানিক বা সরকারি উৎস ছাড়া এসব তথ্য বিশ্বাস করা উচিত নয়।
সবশেষে মনে রাখতে হবে, ভূমিকম্পের সময় কয়েকটি সঠিক সিদ্ধান্ত জীবন বাঁচাতে পারে। আগে থেকে প্রস্তুতি নেওয়া, নিরাপদ জায়গা চেনা, ভারী জিনিস স্থির করে রাখা, জরুরি ব্যাগ প্রস্তুত রাখা এবং ভূমিকম্পের সময় সঠিকভাবে নিজেকে রক্ষা করা—এসব অভ্যাসই দুর্যোগের ক্ষতি কমানোর সবচেয়ে বাস্তব উপায়।
বাংলাদেশে ভূমিকম্পের ঝুঁকি
বাংলাদেশকে সাধারণত খুব ভূমিকম্পপ্রবণ দেশ হিসেবে মনে না হলেও বাস্তবে দেশের বিভিন্ন অঞ্চল ভূমিকম্পের ঝুঁকিতে রয়েছে। বাংলাদেশের অবস্থান এমন একটি ভূতাত্ত্বিক অঞ্চলে, যার আশপাশে কয়েকটি সক্রিয় ভূতাত্ত্বিক কাঠামো ও ফল্ট রয়েছে। ফলে দেশের বিভিন্ন এলাকায় ভূমিকম্পের কম্পন অনুভূত হওয়ার পাশাপাশি বড় ভূমিকম্পের ঝুঁকিও একেবারে উড়িয়ে দেওয়া যায় না।
বাংলাদেশের পূর্ব ও উত্তর-পূর্বাঞ্চলের আশপাশে ভারতীয় প্লেট, ইউরেশীয় প্লেট এবং বার্মা মাইক্রোপ্লেটের জটিল ভূতাত্ত্বিক গতিবিধি রয়েছে। এসব প্লেট ও ভূতাত্ত্বিক কাঠামোর পারস্পরিক চাপ ও নড়াচড়া এই অঞ্চলে ভূমিকম্পের সম্ভাবনার একটি গুরুত্বপূর্ণ কারণ।
বিশেষ করে সিলেট ও চট্টগ্রাম অঞ্চলের আশপাশে ভূমিকম্পের ঝুঁকি তুলনামূলকভাবে বেশি বলে ভূতাত্ত্বিক গবেষণায় গুরুত্ব দেওয়া হয়। তবে এর অর্থ এই নয় যে দেশের অন্য অঞ্চল নিরাপদ। বাংলাদেশের বিভিন্ন এলাকায় ভূমিকম্পের কম্পন অনুভূত হতে পারে এবং বড় ভূমিকম্প হলে এর প্রভাব বিস্তৃত এলাকাজুড়ে পড়তে পারে।
বাংলাদেশের ভূমিকম্প ঝুঁকির আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো দ্রুত নগরায়ণ ও জনসংখ্যার ঘনত্ব। বিশেষ করে ঢাকা শহরের মতো ঘনবসতিপূর্ণ এলাকায় বড় ধরনের ভূমিকম্প হলে ক্ষয়ক্ষতির মাত্রা অনেক বেশি হতে পারে। কারণ এখানে বিপুল সংখ্যক মানুষ তুলনামূলক ছোট এলাকায় বসবাস করে এবং অনেক স্থাপনা, রাস্তা, বিদ্যুৎ, গ্যাস ও যোগাযোগব্যবস্থা পরস্পরের সঙ্গে ঘনভাবে যুক্ত।
শুধু ভূমিকম্পের মাত্রাই ক্ষয়ক্ষতি নির্ধারণ করে না। ভবন কতটা শক্তিশালী, নির্মাণের সময় প্রকৌশল নকশা ও নির্মাণবিধি মানা হয়েছে কি না, মাটির ধরন কেমন এবং জরুরি উদ্ধারব্যবস্থা কতটা প্রস্তুত—এসব বিষয়ও অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
ঢাকার কিছু এলাকায় নরম মাটি ও পললভূমির উপস্থিতি ভূমিকম্পের কম্পনের প্রভাব বাড়াতে পারে। নির্দিষ্ট ধরনের নরম ও পানিতে সম্পৃক্ত মাটিতে শক্তিশালী ভূমিকম্পের সময় মাটির আচরণ পরিবর্তিত হতে পারে, ফলে ভবন ও অবকাঠামোর ওপর অতিরিক্ত চাপ তৈরি হওয়ার আশঙ্কা থাকে।
বাংলাদেশের পুরোনো ও ঘনবসতিপূর্ণ এলাকাগুলোতেও ঝুঁকি রয়েছে। অনেক ভবন পুরোনো, কোথাও ভবনের নকশা বা নির্মাণে নিয়ম মানার ঘাটতি থাকতে পারে, আবার কোথাও ভবনের ওপর অতিরিক্ত কাঠামোগত চাপ তৈরি হয়েছে। এসব বিষয় বড় ভূমিকম্পের সময় বিপদ বাড়াতে পারে।
তবে ঝুঁকি থাকা মানেই বড় দুর্যোগ অনিবার্য—এমন নয়। সঠিক পরিকল্পনা, ভূমিকম্প-সহনশীল ভবন নির্মাণ, পুরোনো ভবনের কাঠামোগত পরীক্ষা, নির্মাণবিধি কঠোরভাবে অনুসরণ এবং মানুষের সচেতনতা বাড়ানো গেলে ক্ষয়ক্ষতি উল্লেখযোগ্যভাবে কমানো সম্ভব।
বাংলাদেশে ভূমিকম্প পর্যবেক্ষণের জন্য বিভিন্ন পর্যবেক্ষণ কেন্দ্র ও আধুনিক যন্ত্রপাতি ব্যবহার করা হয়। এসব যন্ত্রের মাধ্যমে ভূমিকম্পের কম্পন রেকর্ড করা, অবস্থান নির্ণয় এবং ভূমিকম্প সম্পর্কে বৈজ্ঞানিক তথ্য সংগ্রহ করা সম্ভব হয়। ভবিষ্যতে আরও উন্নত পর্যবেক্ষণ নেটওয়ার্ক, দ্রুত তথ্য বিশ্লেষণ এবং কার্যকর সতর্কবার্তা ব্যবস্থা ভূমিকম্পের ঝুঁকি মোকাবিলায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে।
বাংলাদেশের জন্য সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো আতঙ্কিত হওয়া নয়, বরং প্রস্তুত থাকা। ভূমিকম্পের সঠিক সময় আগে থেকে বলা সম্ভব না হলেও ঝুঁকিপূর্ণ ভবন শনাক্ত করা, নিরাপদ নির্মাণ নিশ্চিত করা, জরুরি উদ্ধারব্যবস্থা শক্তিশালী করা এবং সাধারণ মানুষকে সঠিক নিরাপত্তা পদ্ধতি শেখানো সম্ভব।
একটি বড় ভূমিকম্প হয়তো আমরা ঠেকাতে পারব না, কিন্তু তার কারণে কতটা ক্ষতি হবে, তার ওপর মানুষের প্রস্তুতির বড় প্রভাব রয়েছে। তাই বাংলাদেশে ভূমিকম্পের ঝুঁকি নিয়ে আলোচনা মানে শুধু ভয় তৈরি করা নয়; বরং সময় থাকতে সচেতন হয়ে এমন একটি সমাজ গড়ে তোলা, যেখানে দুর্যোগ এলে মানুষ জানবে কীভাবে নিজেকে এবং অন্যকে নিরাপদ রাখতে হবে।
ঢাকায় ভূমিকম্পের সময় ঝুঁকিপূর্ণ ভবন
ঢাকায় ভূমিকম্পের সময় সব ভবন সমান ঝুঁকিপূর্ণ নয়। ভবনের নকশা, নির্মাণের মান, মাটির ধরন, ভবনের বয়স এবং পরে করা পরিবর্তনের ওপর ক্ষয়ক্ষতির মাত্রা অনেকটাই নির্ভর করে। বাংলাদেশে নগর ভবনের ভূমিকম্পঝুঁকি নিয়ে বিভিন্ন মূল্যায়নেও নির্মাণপদ্ধতি ও বিদ্যমান ভবনের দুর্বলতাকে গুরুত্বপূর্ণ কারণ হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে। (Asian Development Bank)
যে ধরনের ভবন তুলনামূলক বেশি ঝুঁকিতে থাকতে পারে:
- নিচতলা খুব খোলা বা “Soft Story” ভবন: নিচতলায় দোকান, পার্কিং বা গাড়ি রাখার জন্য অনেক দেয়াল সরিয়ে দেওয়া হলে নিচের তলা ওপরের তলার তুলনায় দুর্বল হয়ে যেতে পারে। শক্তিশালী ভূমিকম্পে এ ধরনের ভবনে নিচতলায় অতিরিক্ত চাপ পড়ে ধসের ঝুঁকি বাড়ে।
- পুরোনো ও দুর্বল ভবন: দীর্ঘদিনের ক্ষয়, নিম্নমানের নির্মাণ, অপর্যাপ্ত রক্ষণাবেক্ষণ বা পুরোনো নকশার কারণে কিছু ভবনের ভূমিকম্প সহনশীলতা কম হতে পারে। ঢাকার পুরোনো ও ঘনবসতিপূর্ণ এলাকায় এমন ঝুঁকিপূর্ণ স্থাপনা নিয়ে উদ্বেগ রয়েছে।
- নির্মাণবিধি না মেনে তৈরি ভবন: নকশা ও নির্মাণের সময় প্রয়োজনীয় প্রকৌশল মানদণ্ড অনুসরণ না করা হলে ভবনের কাঠামোগত নিরাপত্তা কমে যেতে পারে। বাংলাদেশে নির্মাণবিধি বাস্তবায়নের ঘাটতিকে ভবনের দুর্বলতার একটি কারণ হিসেবে বিভিন্ন প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। (World Bank)
- দুর্বল কলাম-বিম ও সংযোগ: ভূমিকম্পের সময় ভবনের কলাম, বিম এবং তাদের সংযোগস্থলকে বারবার দিক পরিবর্তনকারী শক্তি সহ্য করতে হয়। পর্যাপ্ত রড, সঠিক স্টিরাপ বা উপযুক্ত ডিটেইলিং না থাকলে কাঠামো হঠাৎ দুর্বল হয়ে পড়তে পারে।
- ভবনের ওপর অতিরিক্ত তলা বা অননুমোদিত পরিবর্তন: ভবনটি যে পরিমাণ ভার বহনের জন্য নকশা করা হয়েছিল, তার চেয়ে বেশি তলা যোগ করা বা কাঠামোগত পরিবর্তন করা ঝুঁকি বাড়াতে পারে—বিশেষ করে প্রকৌশলগত যাচাই ও শক্তিশালীকরণ ছাড়া এমন পরিবর্তন করা হলে।
- অনিয়মিত নকশার ভবন: ভবনের আকৃতি, দেয়াল, কলাম বা সিঁড়ির অবস্থান একদিকে বেশি ভারী বা অসম হলে ভূমিকম্পের সময় ভবন মোচড়ানোর মতো আচরণ করতে পারে। এ ধরনের plan বা vertical irregularity সঠিকভাবে নকশায় বিবেচনা না করলে ক্ষতির ঝুঁকি বাড়ে।
- দুর্বল মাটির ওপর নির্মিত ভবন: ভবনের কাঠামো ভালো হলেও মাটির বৈশিষ্ট্য ভূমিকম্পের সময় ভূমির কম্পন ও ভবনের প্রতিক্রিয়াকে প্রভাবিত করতে পারে। তাই শুধু ভবনের নকশা নয়, ভবনের ভিত্তি ও মাটির প্রকৌশলগত বৈশিষ্ট্যও বিবেচনা করা জরুরি। (World Bank Blogs)
সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, শুধু ভবন দেখতে পুরোনো বা নতুন—এটি দেখে ভূমিকম্পে ভবনটি কতটা নিরাপদ তা নিশ্চিত করা যায় না। প্রকৌশলগত পরীক্ষা, নকশা ও নির্মাণের মান, ভবনের কাঠামোগত অবস্থা এবং প্রয়োজন হলে seismic assessment বা retrofitting-এর মাধ্যমে প্রকৃত ঝুঁকি নির্ণয় করা উচিত।
ঢাকার ক্ষেত্রে তাই ভূমিকম্পের ক্ষয়ক্ষতি কমানোর অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ হলো নিরাপদ নকশা, মানসম্মত নির্মাণ, নির্মাণবিধির যথাযথ প্রয়োগ এবং পুরোনো বা দুর্বল ভবনের প্রকৌশলগত মূল্যায়ন ও প্রয়োজনীয় শক্তিশালীকরণ।
সামনে এগোনোর দিকনির্দেশ
ভূমিকম্প এমন একটি প্রাকৃতিক দুর্যোগ, যাকে আমরা থামাতে পারি না এবং ঠিক কখন, কোথায় ও কত শক্তিশালী ভূমিকম্প হবে—তা নির্ভুলভাবে আগে থেকে বলা এখনো সম্ভব নয়। কিন্তু তাই বলে ভূমিকম্পের ক্ষয়ক্ষতি কমানোর কোনো উপায় নেই—এমনটা নয়। সঠিক জ্ঞান, আগাম প্রস্তুতি, নিরাপদ ভবন নির্মাণ এবং দুর্যোগের সময় সঠিক সিদ্ধান্ত অনেক জীবন রক্ষা করতে পারে।
ভূমিকম্প মূলত পৃথিবীর অভ্যন্তরে জমে থাকা শক্তি হঠাৎ মুক্ত হওয়ার ফলে সৃষ্টি হয়। টেকটোনিক প্লেটের নড়াচড়া, আগ্নেয়গিরির কার্যকলাপ এবং কিছু ক্ষেত্রে মানুষের কর্মকাণ্ড এর কারণ হতে পারে। ভূমিকম্পের ফলে শুধু মাটি কেঁপে ওঠে না, ভবন ধসে পড়া, ভূমিধস, সুনামি, আগুন এবং যোগাযোগব্যবস্থার ক্ষতির মতো নানা বিপদও তৈরি হতে পারে।
তাই ভূমিকম্পের প্রস্তুতি শুধু দুর্যোগের মুহূর্তের জন্য নয়, বরং স্বাভাবিক সময় থেকেই শুরু করা উচিত। ঘরের ভারী আসবাবপত্র নিরাপদে রাখা, জরুরি ব্যাগ প্রস্তুত রাখা, পরিবারের সদস্যদের সঙ্গে একটি জরুরি পরিকল্পনা করা, ভবনের নিরাপত্তা সম্পর্কে সচেতন থাকা এবং নিয়মিত ভূমিকম্পের মহড়া করা—এসব ছোট ছোট প্রস্তুতি বড় বিপদের সময় অনেক কাজে আসতে পারে।
ভূমিকম্প শুরু হলে আতঙ্কিত হয়ে দৌড়াদৌড়ি না করে মাথা ও শরীরকে নিরাপদ রাখা সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ। ঘরের ভেতরে থাকলে নিচু হয়ে মজবুত টেবিল বা ডেস্কের নিচে আশ্রয় নিয়ে মাথা ও ঘাড় ঢেকে শক্তভাবে ধরে থাকা উচিত। বাইরে থাকলে ভবন, বৈদ্যুতিক খুঁটি ও অন্যান্য ঝুঁকিপূর্ণ স্থান থেকে দূরে থাকতে হবে। আর ভূমিকম্পের পরেও সতর্ক থাকতে হবে, কারণ পরবর্তী কম্পন বা আফটারশক আবারও ক্ষতির কারণ হতে পারে।
বাংলাদেশের মতো ঘনবসতিপূর্ণ দেশে ভূমিকম্পের ঝুঁকি সম্পর্কে সচেতনতা আরও গুরুত্বপূর্ণ। বিশেষ করে শহরাঞ্চলে ভবনের গুণগত মান, নির্মাণবিধি মেনে চলা, ঝুঁকিপূর্ণ স্থাপনা শনাক্ত করা এবং সাধারণ মানুষের দুর্যোগ প্রস্তুতি বাড়ানো অত্যন্ত জরুরি। ভূমিকম্প পর্যবেক্ষণ, সিসমিক সেন্সর, দ্রুত সতর্কবার্তা এবং আধুনিক প্রকৌশল প্রযুক্তি আমাদের প্রস্তুতিতে সহায়তা করতে পারে, তবে প্রযুক্তির পাশাপাশি মানুষের সচেতনতা ও সঠিক আচরণও সমান গুরুত্বপূর্ণ।
সবচেয়ে বড় কথা হলো, ভূমিকম্পের সময় কয়েক সেকেন্ডের সঠিক সিদ্ধান্তও কখনো কখনো জীবন বাঁচাতে পারে। তাই ভূমিকম্পকে ভয় পাওয়ার পাশাপাশি এর সম্পর্কে জানা, পরিবারের অন্যদের জানানো এবং প্রয়োজনীয় প্রস্তুতি নেওয়াই বুদ্ধিমানের কাজ। আজ নেওয়া একটি ছোট প্রস্তুতি হয়তো কোনো এক কঠিন মুহূর্তে আপনার নিজের কিংবা আপনার প্রিয় মানুষের জীবন রক্ষা করতে পারে।
READ MORE : মেঘ কীভাবে তৈরি হয়? মেঘ থেকে বৃষ্টি কীভাবে নামে?
ভূমিকম্প নিয়ে সাধারণ প্রশ্ন ও উত্তর (FAQ)
১. ভূমিকম্প কী?
ভূমিকম্প হলো পৃথিবীর ভূ-পৃষ্ঠের হঠাৎ কেঁপে ওঠা। সাধারণত ভূ-অভ্যন্তরে টেকটোনিক প্লেটের নড়াচড়া বা ভূত্বকের কোনো অংশে জমে থাকা শক্তি হঠাৎ মুক্ত হলে ভূমিকম্প সৃষ্টি হয়।
২. ভূমিকম্প কেন হয়?
ভূমিকম্পের প্রধান কারণ হলো টেকটোনিক প্লেটের নড়াচড়া। প্লেটগুলো একে অপরের দিকে এগিয়ে গেলে, দূরে সরে গেলে বা পাশাপাশি ঘর্ষণের মাধ্যমে সরে গেলে ভূত্বকের ভেতরে চাপ তৈরি হয়। সেই চাপ হঠাৎ মুক্ত হলে ভূমিকম্প হতে পারে।
৩. ভূমিকম্পের কেন্দ্র ও উপকেন্দ্র কী?
ভূমিকম্প যে স্থান থেকে ভূ-অভ্যন্তরে শুরু হয় তাকে ভূমিকম্পের কেন্দ্র বা Focus বলা হয়। আর সেই কেন্দ্রের ঠিক ওপরের ভূ-পৃষ্ঠের স্থানকে উপকেন্দ্র বা Epicenter বলা হয়। উপকেন্দ্রের আশপাশে অনেক সময় কম্পন তুলনামূলক বেশি অনুভূত হতে পারে।
৪. ভূমিকম্পের মাত্রা কীভাবে মাপা হয়?
ভূমিকম্পের শক্তি বা মাত্রা নির্ণয়ের জন্য বর্তমানে Moment Magnitude Scale বা Mw বহুল ব্যবহৃত হয়। সিসমোমিটার বা সিসমোগ্রাফের সাহায্যে ভূমিকম্পের কম্পন রেকর্ড করে এর বিভিন্ন বৈশিষ্ট্য বিশ্লেষণ করা হয়।
৫. রিখটার স্কেল কি এখনো ভূমিকম্প মাপতে ব্যবহার করা হয়?
রিখটার স্কেল ভূমিকম্প পরিমাপের ইতিহাসে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ হলেও বড় ভূমিকম্পের ক্ষেত্রে বর্তমানে Moment Magnitude Scale বা Mw বেশি উপযোগী। সাধারণ আলোচনায় মানুষ এখনো “রিখটার স্কেল” শব্দটি ব্যবহার করে থাকে।
৬. ভূমিকম্প কি আগে থেকে নির্ভুলভাবে বলা যায়?
না। বর্তমানে কোনো নির্দিষ্ট ভূমিকম্প ঠিক কোন দিন, কোন সময়, কোথায় এবং কত মাত্রায় হবে—এভাবে নির্ভুলভাবে আগে থেকে বলা সম্ভব নয়। তবে ভূমিকম্প পর্যবেক্ষণ, ঝুঁকি বিশ্লেষণ এবং কিছু ক্ষেত্রে Early Warning প্রযুক্তির মাধ্যমে কম্পন পৌঁছানোর আগে অল্প সময়ের সতর্কতা দেওয়া যেতে পারে।
৭. ভূমিকম্পের সময় ঘরের ভেতরে থাকলে কী করা উচিত?
ঘরের ভেতরে থাকলে আতঙ্কিত হয়ে বাইরে দৌড়ে না গিয়ে নিচু হয়ে মজবুত টেবিল বা ডেস্কের নিচে আশ্রয় নেওয়া উচিত। দুই হাত দিয়ে মাথা ও ঘাড় ঢেকে শক্তভাবে ধরে থাকতে হবে। জানালা, কাচ, আলমারি ও ভারী জিনিস থেকে দূরে থাকা নিরাপদ।
৮. ভূমিকম্পের সময় লিফট ব্যবহার করা উচিত কি?
না। ভূমিকম্পের সময় লিফট ব্যবহার করা উচিত নয়। বিদ্যুৎ চলে গেলে বা ভবনের কোনো অংশ ক্ষতিগ্রস্ত হলে লিফটে আটকে পড়ার ঝুঁকি থাকে। কম্পন থামার পরও ক্ষতিগ্রস্ত ভবনে প্রবেশের ক্ষেত্রে সতর্ক থাকতে হবে।
৯. ভূমিকম্পের সময় বাইরে থাকলে কী করণীয়?
বাইরে থাকলে ভবন, বৈদ্যুতিক খুঁটি, সাইনবোর্ড, গাছ এবং অন্য কোনো পড়ে যেতে পারে এমন বস্তু থেকে দূরে সরে খোলা জায়গায় অবস্থান করা উচিত। যতটা সম্ভব শান্ত থেকে নিজের মাথা ও শরীরকে নিরাপদ রাখতে হবে।
১০. ভূমিকম্পের সময় গাড়িতে থাকলে কী করা উচিত?
গাড়িতে থাকলে নিরাপদ স্থানে ধীরে গাড়ি থামিয়ে গাড়ির ভেতরেই থাকা ভালো। সেতু, উড়ালসড়ক, বৈদ্যুতিক খুঁটি, বড় গাছ বা ভবনের কাছাকাছি গাড়ি থামানো উচিত নয়। কম্পন থামার পর পরিস্থিতি দেখে সতর্কভাবে চলাচল করতে হবে।
১১. ভূমিকম্পের পর আবার কি ভূমিকম্প হতে পারে?
হ্যাঁ। বড় ভূমিকম্পের পর আফটারশক বা পরবর্তী কম্পন হতে পারে। এগুলো কখনো দুর্বল ভবন বা ইতিমধ্যে ক্ষতিগ্রস্ত স্থাপনার জন্য অতিরিক্ত ঝুঁকি তৈরি করতে পারে। তাই মূল ভূমিকম্পের পরও সতর্ক থাকা জরুরি।
১২. ভূমিকম্পের কারণে কি সুনামি হতে পারে?
হ্যাঁ, কিছু শক্তিশালী সমুদ্রতলীয় ভূমিকম্প সমুদ্রের পানির স্তরে বড় পরিবর্তন ঘটিয়ে সুনামি সৃষ্টি করতে পারে। তবে সব ভূমিকম্পের কারণে সুনামি হয় না। সমুদ্রের কাছাকাছি এলাকায় শক্তিশালী ভূমিকম্প অনুভূত হলে সরকারি সতর্কবার্তা গুরুত্বসহকারে অনুসরণ করা উচিত।
১৩. ভূমিকম্প থেকে পুরোপুরি নিরাপদ থাকার কোনো উপায় আছে কি?
ভূমিকম্পের ঝুঁকি পুরোপুরি দূর করা সম্ভব নয়। তবে ভূমিকম্প-সহনশীল ভবন নির্মাণ, ভবনের নিরাপত্তা পরীক্ষা, ভারী আসবাবপত্র সঠিকভাবে স্থাপন, জরুরি সরঞ্জাম প্রস্তুত রাখা এবং নিয়মিত মহড়ার মাধ্যমে ক্ষয়ক্ষতির ঝুঁকি অনেকটাই কমানো যায়।
১৪. বাংলাদেশে ভূমিকম্পের ঝুঁকি আছে কি?
হ্যাঁ। বাংলাদেশের বিভিন্ন অঞ্চল ভূমিকম্পের ঝুঁকির মধ্যে রয়েছে। দেশের আশপাশের সক্রিয় ভূতাত্ত্বিক অঞ্চল, ঘনবসতি, অপরিকল্পিত নগরায়ণ এবং কিছু ভবনের নির্মাণগত দুর্বলতা ভূমিকম্প হলে ক্ষয়ক্ষতির ঝুঁকি বাড়াতে পারে। তাই বাংলাদেশে ভূমিকম্প সম্পর্কে সচেতনতা ও প্রস্তুতি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
১৫. ভূমিকম্পের জন্য আগে থেকে কী কী প্রস্তুতি নেওয়া উচিত?
আগে থেকেই পরিবারের জন্য একটি জরুরি পরিকল্পনা তৈরি করা, নিরাপদ স্থানের অবস্থান জানা, ভারী আসবাবপত্র ভালোভাবে স্থাপন করা, জরুরি ব্যাগ প্রস্তুত রাখা, টর্চ ও প্রয়োজনীয় ওষুধসহ জরুরি সামগ্রী রাখা এবং পরিবারের সদস্যদের Drop, Cover, Hold On পদ্ধতি শেখানো উচিত। নিয়মিত মহড়া করলে জরুরি মুহূর্তে আতঙ্ক কমিয়ে দ্রুত সঠিক সিদ্ধান্ত নেওয়া সহজ হয়।
